পুড়ে যাচ্ছে তরমুজগাছ, নিঃস্ব কৃষক দিশাহারা

নিম্নমানের বীজ ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করায় উপকারী কীটপতঙ্গ ফুলে বসতে পারেনি।

তরমুজগাছে ফুল এলেও তা ঝরে গেছে। ফল আসেনি। সম্প্রতি আমতলী উপজেলার সোনাখালী গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

কেউ দাদনে, কেউ ধারদেনা করে তরমুজের চাষ করেছিলেন। ভালোভাবেই বেড়ে ওঠে গাছগুলো। লাভের আশায় বুক বাঁধছিলেন কৃষকেরা। যখন ফল ধরার সময় এল, তখন তরমুজগাছে শুরু হয় পোড়া রোগ। এতে আকাশ ভেঙে পড়েছে কৃষকদের মাথায়। নিশ্চিত ক্ষতি দেখতে পেয়ে তাঁরা এখন দিশাহারা। লাখ টাকার দেনার চাপে পড়ছেন অনেক কৃষক।

বরগুনার আমতলী উপজেলার বেশির ভাগ তরমুজের খেতই পুড়ে যাচ্ছে। উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের পাতাকাটা, চন্দ্রা, হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ রাওঘা, কুকুয়ার কৃষ্ণনগর, আঠারোগাছিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম সোনাখালী, গুলিশাখালী, হলদিয়া ও টেপুরা গ্রাম ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। মাঠভরা আধমরা তরমুজগাছ, কিন্তু তরমুজ নেই। হলুদ বর্ণ হয়ে পুড়ে যাচ্ছে পাতাগুলো।

হলদিয়া ইউনিয়নের টেপুরা গ্রামের কৃষক আবুল কালাম মাস্টার বলেন, ধারদেনা করে তিন একর জমিতে পৌনে দুই লাখ টাকা খরচ করে তরমুজ চাষ করেছিলেন। কিন্তু এক টাকাও বিক্রি করতে পারেননি। কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন, সেই চিন্তায় তাঁর ঘুম নেই। ধারে টাকা এনেছেন স্ত্রীর ব্যবহৃত গয়না বন্ধক রেখে। একই গ্রামের মজিবর শেখ বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। মহাজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা দাদন আনছি। আমার নিজের টাকা অনেক খরচ করেছি। খেতে তরমুজ না আসায় দুশ্চিন্তায় আছি। ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য পাওনাদাররা চাপ দিচ্ছেন, এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’

উপজেলার পশ্চিম সোনাখালী গ্রামের কৃষক বাহাউদ্দিন হাওলাদার ধারদেনা করে এ বছর ২৬ একর জমিতে তরমুজ আবাদ করেছিলেন। গাছে প্রচুর ফুল দেখে আশায় বুক বেঁধেছিলেন, এ বছর বাম্পার ফলন পাবেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যেতে যেতে এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বাহাউদ্দিন বলেন, ‌‘মোগো কপালটা এইবার পুইড়্যা গ্যাছে। এহন ধারদেনা ক্যামনে দিমু, বউ-বাচ্চা লইয়্যা খামু কী, কিচ্ছু কইতে পারি না।’

পাইকারি তরমুজ ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, এ বছরের মতো এমন অবস্থা তরমুজচাষিদের কখনো হয়নি। চাষিরা পথে বসে গেছেন। ঋণের বোঝা নিয়ে তাঁরা দিশাহারা।

দেশের বিভিন্ন এলাকার তরমুজের ব্যবসায়ীরা

কোটি কোটি টাকা এখানে লগ্নি করেন তরমুজ চাষে। এখন এই দেনার বোঝা চাষিদের মাথায়। তাঁরা দিশাহারা, অনেক চাষি ঋণের জন্য এরই মধ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মার্চের মাঝামাঝিতে তরমুজের খেতে ফুল আসে। মাসের শেষ দিকে চাষিরা দেখেন ফুল ঝরে যাচ্ছে, ফুল থেকে কোনো ফল আসছে না। পরে চাষিরা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন, নিম্নমানের বীজ থেকে চাষিরা তরমুজের চাষ করেছেন। আর কীটপতঙ্গ দমনে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করায় উপকারী কীটপতঙ্গ ফুলে বসতে পারেনি। ফলে পরাগায়ন হয়নি। এরপর কৃষকদের কৃত্রিম পরাগায়নের পরামর্শ দিয়েছিলেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। এপ্রিলের প্রথম দিকে চাষিরা সে অনুযায়ী কৃত্রিম পরাগায়ন করেন। তাতেও কাজ হয়নি। কয়েক দিন যেতে না যেতেই গাছ শুকিয়ে মারা যেতে শুরু করে। তরমুজের খেতগুলো এখন বিরান হয়ে যাচ্ছে।

আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সি এম রেজাউল করিম বলেন, মানসম্মত বীজ রোপণ করতে না পারা ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরাগায়ন ঘটেনি। ফলে গাছে তরমুজ হয়নি। সরকারিভাবে তরমুজের বীজ সরবরাহ না করায় বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিম্নমানের বীজ সরবরাহ করে কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।