default-image

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার জামদহ গ্রামের কৃষক মেরাজুল ইসলামকে (৫৫) তিন বছর আগে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে মাল্টার চারা দেওয়া হয়েছিল। ১৫ কাঠা জমিতে তিনি ৭০টি গাছ লাগিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার তাঁর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, একটি গাছও নেই। বাগানের জমিতে কপি চাষ করা হয়েছে। মেরাজুলের ছেলে রাকিবুল ইসলাম বললেন, এক বছর পর গাছগুলোতে ফল এসেছিল। কিন্তু পাতা হলুদ হয়ে গাছ মরে যেতে লাগল। আরও ক্ষতির আশঙ্কায় তাঁর বাবা বাগান ভেঙে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মাল্টার বিশেষ যত্ন নিতে হয়। আমগাছের মতো মাটিতে পুঁতে দিলেই ফল ধরে না। যাঁরা সেই যত্ন নিচ্ছেন, তাঁদের বাগান ভালো আছে। রাজশাহীর বাজারে এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে এই মাল্টা পাওয়া যাচ্ছে। খুব বেশি মিষ্টি না হলেও টক নয়। বাজারে এর বেশ চাহিদা আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে মেরাজুলের মতো জেলার ৩০০ চাষিকে প্রদর্শনী খেত করার জন্য ২০১৭ সালে বারি মাল্টা-১ জাতের চারা দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কারও বাগানের গাছ আছে, কারও বাগানে নেই। তবে আরও ভয়ের ব্যাপার, ইউটিউব দেখে উৎসাহিত হয়ে অল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় চাষিরা ঝাঁপিয়ে পড়েন এই মাল্টা চাষে। জেলায় বর্তমানে প্রায় এক হাজার চাষি মাল্টা চাষ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ এখনো কিছু বুঝে উঠতে পারেননি, কারও সর্বনাশের শুরু, আর কারও সর্বনাশ হয়ে গেছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে একসময় ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দিয়ে ধান চাষ করা হতো। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে নিচে নেমে যেতে থাকে। যে পরিমাণ পানি তোলা হয়, বৃষ্টিপাত সেই পরিমাণ না হওয়ার কারণে পানির স্তর আর আগের জায়গায় ওঠে না। এ জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর শস্য বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ নেয়। পানি কম লাগে এমন ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। শুরু হয় নতুন জাতের ফসল চাষের আন্দোলন। এরই ধারাবাহিকতায় টমেটো, আপেলকুল, বাউকুল, পেয়ারা, পাম, কমলা, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম, রামবুটান, পার্সিমন, অ্যাভোকাডো, কফি, বিচিবিহীন কুল, বলসুন্দরী কুল, বিচিবিহীন লেবু, চায়না লেবু ও মাল্টা চাষ শুরু হয়েছে। তবে ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে মাল্টা চাষ। এর আগে শুরু হওয়া কুল চাষ থেমে গেছে। তিন–চার বছরের মাথায় মড়কে গাছ মরে যাওয়ায় পেয়ারাবাগান কমে এসেছে। ভালো বাজার না পেয়ে প্রতিবছর টমেটো রাস্তায় ফেলে দিতে দেখা যায়। ২০১৭ সালে নকল বীজে প্রতারিত হয়ে বীজ কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করে আজও ক্ষতিপূরণ পাননি টমেটোচাষিরা। বাণিজ্যিকভাবে বাজার না পাওয়ায় স্ট্রবেরি চাষ বন্ধের পথে। অন্য ফলগুলো নিয়ে চাষিরা অস্বস্তির মধ্যে আছেন। আর এবার মাল্টা চাষে মার খেয়েছেন চাষিরা।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় মাল্টার বাগান করেছেন অভিজিৎ গুহ (৫২)। তাঁর বাড়ি রাজশাহী নগরের কেদুর মোড় এলাকায়। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। ইউটিউব দেখে তিনি মাল্টা চাষে উৎসাহিত হন। তিনি আরও কয়েকজন অংশীদার নিয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বামনইল ও তানোরের চান্দুড়িয়া এলাকায় প্রায় ১৫০ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে মাল্টাবাগান করেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর বিনিয়োগ প্রায় ৭০ লাখ টাকা। তাঁর গাছের বয়স প্রায় ১ বছর ৮ মাস। এই পর্যায়ে এসে তিনি দেখছেন তাঁর বাগানের ২৫ শতাংশ গাছের পাতা হুলুদ হয়ে যাচ্ছে। হলুদ পাতার গাছটি কিছুদিন পরেই মারা যাচ্ছে। মাল্টা চাষ করে ভাগ্যবদলের স্বপ্ন নিয়ে তিনি দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মাল্টাবাগান দেখতে ছুটে বেড়ান। তাঁর তথ্যমতে, শুধু চুয়াডাঙ্গার একটি বাগানের গাছ সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছে। অভিজিৎ বলেন, তিনি ফল গবেষণা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে গেছেন, যে যা পরামর্শ দিয়েছেন, তাই করে দেখেছেন। কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজশাহীর পবা উপজেলার রনহাট এলাকার চাষি নূরুজ্জামানকে কৃষি বিভাগ থেকে মাল্টার চারা দেওয়া হয়েছিল। দেড় বিঘা জমিতে তিনি ১৯৪টি গাছ রোপণ করেছিলেন। এর মধ্যে ১৪০টি গাছই রোগাক্রান্ত হয়ে গেছে। পাতা হলুদ হয়ে গাছের ডাল মরে যাচ্ছে। আক্রান্ত গাছের ফলগুলো আকারে ছোট হয়ে আসছে। কয়েক দিন আগে তাঁর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, ৫০টি গাছ মোটামুটি সুস্থ আছে। নূরুজ্জামান বলেন, কৃষি বিভাগ থেকে যে ৫৫টি চারা দিয়েছিল, সেগুলোই আগে আক্রান্ত হয়েছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার বামনইল এলাকার চাষি মঞ্জুর রহমান ১২ বিঘা জমিতে মাল্টার বাগান করেছেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বাগান ভালো আছে। ৫ শতাংশ গাছ রোগাক্রান্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাঁর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ গাছের পাতাই হলুদ হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গোদাগাড়ীর কমলাপুর এলাকায় সারিকুল নামের একজন চাষি তাঁর মাল্টাবাগান পুড়িয়ে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, পাতা হলুদ হওয়ার পরেও চিকিৎসা আছে। তাঁরা চাষিদের সেই পরামর্শ দিচ্ছেন। যাঁরা পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করছেন, তাঁদের বাগান ভালো আছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামছুল হক বলেন, মাল্টাগাছের পাতা হলুদ হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত। বিষয়টি তিনি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটকেও জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, পঞ্চগড়ের মাটি ও আবহাওয়া মাল্টা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী, সেখানেও এই রোগ দেখা দিয়েছে। মাল্টা ধান, পাট আমের মতো নয়। বিশেষ যত্ন নিতে হবে। তা ছাড়া হবে না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন