default-image

গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করেন নারীরা। এ থেকে যে আয় হয়, তা সাধারণত তাঁদের নিজস্ব হিসাবের খাতাতেই থাকে। যত্নে পালন করা হাঁস-মুরগি ভালো থাকলে নারীদের সেই হিসাবের খাতাও ভালো থাকে। আর রোগবালাই দেখা দিলে হিসাবের খাতায়ও দেখা দেয় ‘গরমিল’।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গ্রামীণ নারীদের এই ‘হিসাবের খাতা’ সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব নিয়েছেন দুই শতাধিক নারী। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে হাঁস-মুরগিসহ গবাদিপশুকে প্রতিষেধক দেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা রোগবালাই প্রতিরোধে সহায়তা করছেন। এ কার্যক্রম শুরুর পর রোগবালাই কমে উপজেলায় হাঁস-মুরগির সংখ্যা দুই বছরে বেড়েছে দেড় গুণেরও বেশি। পাশাপাশি এসব নারীর নিজেদেরও দিনবদল হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

যেভাবে শুরু

বছর তিনেক আগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের উদ্যোগে নন্দনপুর গ্রামে আয়োজন করা হয় উঠান বৈঠকের। সেখানে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর লালন-পালন নিয়ে কথা বলছিলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হারুনূর রশীদ। প্রাণিসম্পদ কার্যালয় প্রায়ই এমন উঠান বৈঠক করে থাকে।

বৈঠকে নারীরা জানালেন, রোগবালাইয়ে তাঁদের হাঁস-মুরগি মারা যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় জানতে চাইলেন তাঁরা। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হারুনূর রশীদ জানালেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যে কেউ গিয়ে নামমাত্র খরচে হাঁস–মুরগির প্রতিষেধক নিতে পারেন, এতে হাঁস–মুরগি রক্ষা পাবে। কিন্তু নারীরা বললেন, ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যাওয়া তাঁদের জন্য কঠিন। যাতায়াত খরচের পাশাপাশি সময়ও লেগে যাবে অনেক। তখন হারুনূর রশীদ নারীদের হাঁস-মুরগির প্রতিষেধক পুশ করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। ওই উঠান বৈঠকেই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখালেন ছয়জন। এরপর পিয়েদহ, সোনাতলা, তলটসহ বেশ কিছু গ্রামে উঠান বৈঠক করে প্রশিক্ষণে আগ্রহী ২৫ থেকে ৩০ জন নারীর তালিকা তৈরি করা হয়। এরপর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে আয়োজন করা হয় তিন দিনের প্রশিক্ষণের। সেখানে নারীরা হাঁস-মুরগিকে প্রতিষেধক দেওয়ার প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি গবাদিপশুরও বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কেও জ্ঞান দেওয়া হয় তাঁদের। প্রশিক্ষণ শেষে নারীরা প্রতিষেধকসহ অন্য সরঞ্জাম কিনে বাড়ি ফিরে কাজ শুরু করলেন।

কাজ শুরু

প্রথম ব্যাচে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নন্দনপুর গ্রামের সুলতানা খাতুন। কিন্তু প্রথম দিকে প্রতিবেশীরা তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারছিলেন না। মানুষের আস্থা অর্জনে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিনা মূল্যে হাঁস–মুরগিকে প্রতিষেধক দেন তিনি। এরই মধ্যে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাসহ মাঠকর্মীরাও গ্রামে গিয়ে সুলতানার মাধ্যমে প্রতিষেধক দেওয়ার ব্যাপারে মানুষকে বোঝান। একপর্যায়ে মানুষের আস্থা আসতে শুরু করে। গ্রামের লোকজন হাঁস-মুরগি নিয়ে সুলতানার কাছে আসতে শুরু করেন। সুলতানার মতো অন্য প্রশিক্ষিত নারীরাও নিজেদের গ্রামে হাঁস–মুরগির প্রতিষেধক দিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিষেধক থেকে আয়

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে প্রশিক্ষিত নারীরা সরকারনির্ধারিত দামে প্রতিষেধকসহ অন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করেন। প্রাণিসম্পদ কার্যালয় ও প্রশিক্ষিত নারীরা জানান, সব মিলিয়ে প্রতিটি হাঁস বা মুরগির পেছনে প্রতিষেধক বাবদ খরচ হয় মাত্র ১৫ পয়সা। কিন্তু হাঁস-মুরগিকে প্রতিষেধক দেওয়ার পর এর মালিকেরা ২ থেকে ৩ টাকা দিয়ে থাকেন। বেশির ভাগ দিনেই তাঁরা ২০০ থেকে ৩০০ হাঁস-মুরগিকে প্রতিষেধক দেন। সেই হিসাবে গড়ে দিনে তাঁদের আয় ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন উপজেলার দুই শতাধিক নারী। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে প্রথম আলোর। তাঁরা মাত্র দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে অভাব দূর করে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার গল্প শুনিয়েছেন।

তাঁদের একজন পিয়েদহ গ্রামের হেলেনা খাতুন। স্বামী কৃষিশ্রমিক। প্রায় দুই বছর ধরে হেলেনা প্রতিষেধক দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করছেন। তাঁর আয়েই পড়াশোনা করছে তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি বলেন, ‘আগে আমাগরে দিন চলত না। অথচ আইজ হাঁস-মুরগির ইনজেকশনের টাকার থ্যা আইজ আমার ভাগ্যের পরিবর্তন হইছে।’

বিজ্ঞাপন

হাঁস-মুরগি বাড়ছে

সাঁথিয়ায় নারীদের মাধ্যমে প্রতিষেধক দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করার পর হাঁস-মুরগির সংখ্যা বেড়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উপজেলায় দেশি হাঁস-মুরগির সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২২ হাজার ৪৮১। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৬৭২।

তলট গ্রামের মনিরা পারভীন প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিষেধক দেওয়া শুরু করেন বছর দুই আগে। প্রতিষেধক দেওয়ার আগে তিনি পুরো গ্রাম ঘুরে হাঁস-মুরগির ওপর জরিপ করেছিলেন। সে সময় গ্রামের ২৮০টি বাড়ির মধ্যে হাঁস-মুরগি ছিল ৩০ থেকে ৩৫টি বাড়িতে। অথচ এখন গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই ১০ থেকে ১২টি করে হাঁস-মুরগি আছে।

মনিরা বলেন, ‘আগে রানীক্ষেত ও বসন্ত রোগে প্রচুর মুরগি মারা যেত। এতে নারীরা হাঁস-মুরগি পালন করতেন কম। এখন সামান্য খরচে বাড়ি বসেই প্রতিষেধক দেওয়া যাচ্ছে। তাই হাঁস-মুরগি পালনে আগ্রহ বেড়েছে।’

তলট গ্রামের ইসমত আরা ও সাহেরা খাতুন জানান, আগে হাঁস-মুরগি পালতেন না। কিন্তু এখন তাঁদের বাড়িতে ১০ থেকে ১৫টি করে হাঁস ও মুরগি আছে।

সাঁথিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য নারীরা প্রায়ই যোগাযোগ করে থাকেন। প্রশিক্ষণে আগ্রহীদের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ জন হয়ে উঠলেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হারুনূর রশীদ বলেন, ‘সাঁথিয়ায় ২৬৫টি গ্রাম। এসব গ্রামে এখন দুই শতাধিক প্রশিক্ষিত নারী হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুকে প্রতিষেধক দিচ্ছেন। যদি প্রতি গ্রামেই দু-তিনজন করে প্রশিক্ষিত নারী দিয়ে প্রতিষেধক দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেত, তবে গোটা উপজেলাটি হাঁস-মুরগিতে ভরে উঠত। আমি সে চেষ্টাই করে যাচ্ছি।’

মন্তব্য পড়ুন 0