জাকির হোসেন এখনো মিলের শ্রমিক কলোনির ঘরে থাকেন। তাই ভাড়া লাগে না। তবে ৮০০ টাকা দোকান ভাড়া দিতে হয় তাঁকে। মাসে ৩০ কেজি চাল আর ৮ কেজি আটা কিনতে হয়। এই দুই পণ্যেই প্রায় দুই হাজার টাকা চলে যায়। এর ওপর গ্যাস খরচ, বাচ্চাদের পড়াশোনা, টুকটাক ওষুধপত্র, মাঝেমধ্যে দু–একজন আত্মীয়স্বজনের বেড়াতে আসা; সব মিলিয়ে কম করে হলেও মাসে আট–নয় হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এরই মধ্যে ১০ মাসের দোকান ভাড়া সাড়ে ৮ হাজার টাকা বকেয়া পড়েছে।

কথা বলার ফাঁকে ষষ্ঠ শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে সিফাত এসে বাবার কাছে খাবারের টাকা চায়। পকেট থেকে ৫ টাকার একটা নোট বের করে দিতেই একটু বেশি পাওয়ার আবদার ধরে ছেলে। নিরুপায় বাবা ১০ টাকার নোটটা ধরিয়ে দিয়ে কপট রাগ দেখিয়ে বলেন, ‘দুই দিনের মধ্যে আর কিন্তু পাবা না।’ এরপর সলজ্জ হেসে জাকির হোসেন বলেন, অবস্থা এমন হয়েছে, ছেলেকে দুইটা টাকা দিতেও হিসাব করা লাগছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ দারিদ্র৵ মানচিত্র প্রতিবেদন ২০১৬ অনুযায়ী, খুলনায় দারিদ্র্যের হার ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে জেলাটিতে আয়বৈষম্যের হার দেশে সর্বোচ্চ (উচ্চ দারিদ্র্য রেখা)।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে পিপলস জুট মিলের গেটের পাশে একটি বন্ধ দোকানের সামনের বেঞ্চে একা বসে ছিলেন লিটু শেখ (৪০)। সকালে কাজের খোঁজে বের হয়েছিলেন; তবে মেলেনি। কথা বলে জানা গেল, তাঁর চায়ের দোকান ছিল। করোনার সময় পুঁজি হারিয়ে সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী আর মাকে নিয়ে থাকেন রেল বস্তিতে। তবে সংসার এখন আর চলছে না।

লিটু শেখ বলেন, মাসে আয়ের চেয়ে ব্যয় দ্বিগুণ। মাংস খান না দুই–তিন মাস। মাছ সপ্তাহে এক দিন, কখনো একদম না। সংসারে বলা আছে, যতটুকু না দিলে নয়, ততটুকু তেল দিয়ে রান্না করতে। স্ত্রীও সেভাবেই চালাচ্ছেন। শাকসবজি, ডালভর্তা, আলুভর্তা, এগুলো চলে। আজ কাজ জোটেনি। বয়স্ক ভাতার টাকায় শাশুড়ি কিছু মাছ আর সবজি কিনে দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার খুলনা নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ১১ জনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা সবাই দ্রব্যমূল্য নিয়ে হতাশার কথা বললেন। তাঁরা বলেন, এখন ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেকের দেনার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

নগরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার সাইকেলের গ্যারেজ মিস্ত্রি মো. রফিকও (৩৫) সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মাসে ১২ হাজার টাকার মতো আয় হলেও বাসা ভাড়া ও গ্যারেজ ভাড়া দিতে হয়। আর ছয়জনের সংসারে মাংস, মাছ খুব একটা না কিনলেও মাসে ২৫ কেজি চাল, ১০ কেজি আটা, ২ কেজি ডাল, ৫ লিটার তেল লাগে। এসব কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতি মাসে দেনাও হচ্ছে।

দুই বছর আগের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেল কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি খুলনায় সরু চালের খুচরা দর ছিল প্রতিকেজি ৫০-৫২ টাকা, মোটা চাল ছিল ৩০-৩২ টাকা। খোলা আটা প্রতি কেজি ২৭-২৮ টাকা, মসুর ডালের কেজি ১১৫-১২০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৯০-৯২ টাকা লিটার, বোতলজাত তেলের দাম ছিল ৯৮ থেকে ১০০ টাকা লিটার। কাঁচা মরিচের কেজি ছিল ৬০-৮০ টাকা। ফার্মের মুরগি ছিল ১১০ টাকা কেজি। ডিম বিক্রি হতো ৩২ টাকা হালি দরে।

অন্যদিকে ২০২২ সালের ১৩ মার্চের হিসাব বলছে, প্রতি কেজি সরু চাল খুচরায় ৬৬–৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, মোটা চালের কেজি ৪৫-৪৭ টাকা। খোলা আটা প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৩৫-৩৬, মোটা মসুর ডাল ১১০-১২০, খোলা সয়াবিন তেলের লিটার ১৬৬-১৬৮ আর ৫ লিটারের বোতলজাত তেল বিক্রি হয়েছে ৭৮০-৮০০ টাকায়। কাঁচা মরিচের কেজি হয়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ফার্মের মুরগির দাম ১৫০ টাকা কেজি। ডিমের দাম ছিল ৩৬ টাকা হালি।

খুলনা কেসিসি সন্ধ্যা বাজারের ব্যবসায়ী মো. নাঈম বলেন, ‘সবকিছুর দাম কয়েক মাস ধরে বাড়তির দিকে। আমরা তো পাইকারি বাজার থেকে যেভাবে কিনে আনি, সেভাবে সীমিত লাভে বিক্রি করি। এখন পাইকারিতে দাম বাড়লে সেখানে তো আমাদের হাত নেই।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন