বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কক্সবাজার শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার কুতুপালং বাজার। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে ইটের কাঁচা রাস্তায় প্রায় তিন কিলোমিটার গেলে লাম্বাশিয়া রোহিঙ্গা শিবির। কয়েকটি পাহাড় নিয়ে গড়া এই আশ্রয়শিবিরে অন্তত ৭০ হাজার রোহিঙ্গার বসতি। আশপাশে থাকা আরও ২২টি শিবির নিয়ে গড়ে উঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থীর আশ্রয়শিবির ‘কুতুপালং মেগা ক্যাম্প’, যেখানে অন্তত ৯ লাখ রোহিঙ্গার বসতি।

গতকাল বৃহস্পতিবারের মতো আজ শুক্রবারও সকাল সাতটা থেকে ক্যাম্পের দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। রাস্তায় লোকজনের চলাচল তেমন নেই। দোকানপাটও বন্ধ, পরিস্থিতি থমথমে। রোহিঙ্গারা ঘরে বসে সময় অতিবাহিত করছে। বন্ধ দোকান পাহারা দিচ্ছেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্যরা। ফাঁকা রাস্তায় টহল দিচ্ছে পুলিশ। আশ্রয়শিবিরের মোড়ে মোড়ে তল্লাশিচৌকি বসিয়েছে পুলিশ।

আড্ডা দিতে দিতে আবদুল কাদের (৬০) নামের এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘মুহিবুল্লাহর মতো বিচক্ষণ নেতা আমরা (রোহিঙ্গারা) আর পাব না। তিনি সবার প্রিয় নেতা ছিলেন। ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে তাঁর (মুহিবুল্লাহর) চেষ্টার শেষ ছিল না।’

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আলোচনায় আসেন মুহিবুল্লাহ। রোহিঙ্গা কামাল আহমদ (৫৫) বলেন, কিছুদিন আগেও মুহিবুল্লাহ বিদেশ থেকে ঘুরে এসেছেন। নিজের কার্যালয়ে বসে তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিদেশ সফর নিয়ে কথা বলতেন। মিয়ানমারে ফেরার প্রত্যাবাসন জোরদার করার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। এজন্য তিনি মিয়ানমারের সামরিকজান্তা সরকারের টার্গেট ছিলেন। এখন কী কারণে তাঁকে হত্যা করা হলো— তা দেখার বিষয়। কিন্তু রোহিঙ্গারা মুহিবুল্লাহর মতো নেতা আর পাবে না। ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে এমন বিচক্ষণ নেতা আর দ্বিতীয়টি নেই।

মুহিবুল্লাহর পরিবারের দাবি, এই হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিরোধী চক্র অথবা যারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ী করতে চায়—এমন বিশেষ মহল অস্ত্রধারীদের দিয়ে খুনের ঘটনাটি ঘটিয়েছে। আগে মুহিবুল্লার সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ জন নিরাপত্তাকর্মী (বডিগার্ড) থাকত। কিন্তু সেদিন রাতে নিরাপত্তাকর্মীদের তেমন কেউ ছিলেন না। দু–একজন থাকলেও তাঁরা পালিয়ে গেছেন, অস্ত্রধারীদের ধরার চেষ্টা করেননি। এতেই প্রমাণিত হয়—এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

default-image

২০১৯ সালে ২৫ আগস্ট উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের ফুটবল মাঠে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা গণহত্যাবিরোধী যে মহাসমাবেশটি হয়েছিল—তা সংগঠিত করেছিলেন মুহিবুল্লাহ। ওই মহাসমাবেশে মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, নিরাপত্তা, রাখাইনে ফেলে আসা জন্মভিটা ফেরতসহ সাত দফা পূরণ না হলে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এখনো একই দাবিতে অনড় রোহিঙ্গারা।

লাম্বাশিয়া শিবিরের রোহিঙ্গা আবদুল জব্বার (৭০) বলেন, ওই মহাসমাবেশের পর থেকে মুহিবুল্লাহ প্রত্যাবাসনবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রের রোষানলে পড়েন। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে গেলে যাদের বেশি ক্ষতি হতে পারে, তাদের ইন্দন কাজ করেছে মুহিবুল্লাকে হত্যার পেছনে। তাঁর পরিবারও নিরাপত্তাহীন।

এ ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৪ এপিবিএন অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার নাইমুল হক বলেন, মুহিবুল্লাহর বাড়িতে পুলিশের পাহারা আছে। হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে কাজ করছে পুলিশ। রোহিঙ্গা শিবিরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা

মুহিবুল্লাহ হত্যার ঘটনায় গতকাল রাত ১১টায় উখিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার বাদী মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ। এজাহারে অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীর সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়নি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার অনুসন্ধান ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে সেখানে (ক্যাম্পে) যৌথভাবে কাজ করছে জেলা পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। আশ্রয়শিবিরের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় লাম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরের ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইট’ (এআরএসপিএইচ) সংগঠনের কার্যালয়ে ঢোকার সময় বন্দুকধারীদের গুলিতে খুন হন মুহিবুল্লাহ (৪৮)। তিনি ওই সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন। কার্যালয় থেকে ৩০ ফুট দূরে তাঁর ঘর।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন