কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কামারখাল একটি প্রবহমান খাল। এর প্রমাণ এ খালে বেশ কয়েকটি জলকপাট (স্লুইসগেট) রয়েছে। অন্য খালের সঙ্গে এ খালের সংযোগ রয়েছে। তবে এ খালের দুই পাশে বাঁধ দিয়ে ধলীগৌরনগর ইউপি চেয়ারম্যান হেদায়েতুল ইসলাম ও তাঁর ভাইয়েরা ১২ বছর ধরে মাছ চাষ করছেন। মাছ চাষের স্বার্থে জনতা বাজারের পূর্বে কামারখালের মুখে যে বিকল জলকপাট রয়েছে, সে জলকপাটের মুখে দুটি বাঁধ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মৎস্য বিভাগ জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের অর্থায়নে তাঁদের সহযোগিতা করছে।

কৃষকেরা বলেন, প্রবহমান এ খাল হওয়া সত্ত্বেও মৎস্যচাষিদের যোগসাজশে উপজেলা প্রশাসন ২০২১-২২ অর্থবছরে বদ্ধ জলাশয় হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। এতে খালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষে আরও সুবিধা হয়েছে। যদিও জানতে চাইলে ইউএনও পল্লব কুমার হাজরা প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি সরেজমিনে তদন্ত করে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন।

সরেজমিন

৮ এপ্রিল সরেজমিনে দেখা যায়, ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের নরুল্লাহ বাজারের দক্ষিণে জনতা বাজারের দিকে যেতে একটি সেতু তৈরি হচ্ছে নরুল্লাহ খালের ওপর। এ কারণে সেতুর দুই পাশে মাটির বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। এ বাঁধের মতো করেই এ খালের অনেক অংশে এমন বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ হচ্ছে। সেতু পেরিয়ে জনতা বাজার যেতে সড়কের বাঁ পাশ দিয়ে নরুল্লাহ খালটি গিয়ে কামারখালের সঙ্গে মিশেছে। কামারখালের শুরুর আগে উত্তর মাথায় আরেকটি বাঁধ। বাঁধটি মোটা লোহার নেট বাঁধ। নেটের বাঁধের পাশেই মাটির বাঁধের কাজও চলছে। এ রকম আরেকটি বাঁধ আছে কামারখালের দক্ষিণ মাথায় দিঘিরপাড়ে কাউনিয়া (স্থানীয়ভাবে তেকাইচ্ছা খাল নামে পরিচিত) খালের মুখে।

কৃষকেরা ৭ মার্চ ইউএনও ও মৎস্য কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, মৎস্য বিভাগ প্রবহমান জলাশয়কে বদ্ধ জলাশয়ে রূপ দিচ্ছে। এতে কৃষকেরা বিপাকে পড়বেন।

যদিও লালমোহন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস বলেন, তাঁরা প্রবহমান খালকে বদ্ধ জলাশয় বানাননি। উপজেলা প্রশাসন ও সহকারী ভূমি কমিশনার ২০২১-২২ অর্থবছরে বদ্ধ জলাশয় হিসেবে অনুমোদন দেওয়ায় তাঁরা মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কামারখাল জলাশয়ের উন্নয়ন করছেন।

বোরো আবাদে ধস

ধলীগৌরনগর ইউনিয়নে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. লোকমান হোসেন বলেন, ইউনিয়নে বাত্তির খাল, বৈরাগীর খাল, কামারখাল, নুরুল্লাহর খাল, কাউনিয়ার খাল, আরযুগীর খালসহ ছয়–সাতটি খাল রয়েছে। এ খালগুলো বেতুয়াখাল (সাবেক নদী) থেকে উঠে এসে মেঘনায় মিশেছে। কয়েকটি কামারখালের সঙ্গে মিশেছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, লালমোহন উপজেলায় মেঘনা নদীর তীরে তিনটি জলকপাট রয়েছে। উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের কামারখাল ও বাত্তির খালের ওপর দুটি এবং বেতুয়াখালের ওপর একটি। পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ উপজেলার পানিনিষ্কাশন, নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা দূর ও বোরো আবাদ বাড়ানোর স্বার্থে এ জলকপাটগুলো স্থাপন করেছে। শীতে মেঘনা নদীর পানি লবণ হয়ে যায়। এ সময় জলকপাট আটকানো থাকে। তেঁতুলিয়া নদীর মিষ্টি পানি দিয়ে কৃষক বোরো আবাদ করেন। বর্ষায় বৃষ্টির পানি বের করার জন্য জলকপাটগুলো খুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনটি জলকপাটই বিকল হয়ে আছে। শীতে আটকালেও লবণ–পানি প্রবেশ করে। ফলে লর্ডহার্ডিঞ্জ, চরভূতা, রমাগঞ্জ ও ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের সব কটি শীতে শুকিয়ে যায়। যেখানে চারটি ইউনিয়নে পাঁচ-ছয় হাজার হেক্টরে বোরো আবাদ হতো, সেখানে ৫০০ হেক্টরে বোরো আবাদ নেমে এসেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ধলীগৌরনগর ইউপি চেয়ারম্যান হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। তিনি কোনো মাটির বাঁধ দেননি। তিনি কামারখালের দুপাশে লোহার নেটের বাঁধ দিয়ে পাঁচ-ছয় বছর ধরে মাছ চাষ করছেন। এতে কোনো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘যদি মাটির বাঁধ দিয়েও চাষ করি, তা–ও কৃষকের ক্ষতি হবে না।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ভোলা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মামুন আল ফারুক বলেন, বিষয়টি তিনি দেখবেন। এ ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন