default-image

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিরাহিমপুর গ্রামের বাসিন্দা ভসি মামুদ (১০৩)। তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। একমাত্র ছেলে দিনমজুর জাহেদুল ইসলামের সঙ্গে থাকতেন। দুই বছর আগে ভসি মামুদ তাঁর বাঁ চোখে অস্ত্রোপচার করেন। চিকিৎসক তাঁকে এক মাস বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন। অস্ত্রোপচারের ১০ দিন পেরিয়ে গেছে। একদিন সকালে নাতিদের সঙ্গে খেতে বসেন। এ সময় ছেলের স্ত্রী তাঁকে (ভসি মামুদ) বর্গা নেওয়া জমিতে ধান কাটতে যেতে বলেন।

খেতে খেতে ভসি মামুদ বলছিলেন, তাঁর চোখের সমস্যা, এই বয়সে ধান কাটবেন কীভাবে। এ কথা শুনে ছেলের স্ত্রী শ্বশুরের হাত থেকে ভাতের প্লেট কেড়ে নেন। অপমান সইতে না পেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। কোথায় যাবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সেদিন সন্ধ্যায় এক প্রতিবেশীর সহযোগিতায় ‘মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রম’–এর সন্ধান পান। তখন থেকে দুই বছর ধরে এই বৃদ্ধাশ্রমেই আছেন ভসি মামুদ।

শুধু ভসি মামুদই নন, তাঁর মতো অভাগা ১৮ জন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার ঠাঁই হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৮ জন ও নারী ১০ জন। সবার থাকা-খাওয়া, পোশাক, চিকিৎসা ও বিনোদনের ব্যবস্থা সবকিছুই করছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৭ সালের ১৯ মে গোবিন্দগঞ্জের ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ছোট সোহাগি গ্রামে গড়ে ওঠে বৃদ্ধাশ্রমটি। এটি গড়ে তোলার পেছনে অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছেন এলাকার উদ্যমী যুবক আপেল মাহমুদ (৩৫)। ছোট সোহাগি গ্রামেই তাঁর বাড়ি। একটি কমিটির মাধ্যমে এটি পরিচালনা করা হচ্ছে। কমিটির সভাপতি আপেল মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক শামসুজোহা, কোষাধ্যক্ষ মেহেদী মিয়া, সদস্য ছাব্বির রহমান, আজম শেখ, আশরাফুল ইসলাম ও আলমগীর হোসেন। কমিটির বেশির ভাগ সদস্যই ছাত্র।

আপেল মাহমুদ বৃদ্ধাদের দেখভাল করেন। তাঁকে সহায়তা করেন অন্য ছয় তরুণ। তাঁদের কেউ সকালে, কেউ দুপুরে, কেউ রাতে বৃদ্ধাদের খোঁজ নেন। নিজেদের পড়ার খরচ বাঁচিয়ে, ব্যবসা থেকে মাসিক অনুদান দিয়ে বৃদ্ধাশ্রমটি চালানো হচ্ছে। তাঁদের কর্মকাণ্ডে খুশি হয়ে বর্তমানে আরও অনেকে বৃদ্ধাশ্রমে মাসিক অনুদান দিচ্ছেন।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ছোট সোহাগি গ্রাম। কোলাহলমুক্ত নির্জন পরিবেশে একচালা টিনশেড ঘর। চারটি কক্ষ। প্রতিটি কক্ষে বৈদ্যুতিক পাখা। পৃথক পৃথক বিছানা। পাশেই প্রস্রাব-পায়খানার ব্যবস্থা। আঙিনায় রান্নাঘর। সেখানে মধ্যবয়সী দুজন রান্নার কাজ করেন।

উপজেলার তালুককানুপর ইউনিয়নের সমসপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আজিজার রহমান। তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলে রুবেল মিয়া চট্টগ্রামে থাকেন। সেখানে তিনি রিকশা চালান। ছেলে বাবার দেখাশোনা করেন না। ভিক্ষা করে দিন চলত। দুই বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমেই আছেন আজিজার রহমান। তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধাশ্রমে আমি ভালো আছি। আমার নিজের ছেলে দেখে না। কিন্তু যারা দেখছে, তারাই আমার ছেলের মতো। ওদের ভালোবাসায় সুখে আছি।’

সমসপাড়া গ্রামের আরেক বৃদ্ধা সোনা ভান বেওয়া (৬০)। স্বামী আলেচ উদ্দিন চার বছর আগে মারা গেছেন। দুই ছেলের কেউ ভাত দিত না। অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। দেড় বছর আগে তাঁর একটি পা ভেঙে যায়। ঝিয়ের কাজ করতে পারতেন না। তখন থেকে তিনি এই বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। সোনা ভান বেওয়া বলেন, ‘বেটারা হামাক ভাত দ্যায় না। হামরা এমার (বৃদ্ধাশ্রম) বাড়িত ভালো আচি বাবা।’

ছোট সোহাগি গ্রামে অবস্থিত দিকদাইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজল মিয়া বলেন, যে সমাজে ছেলে বাবার খোঁজ নেন না, বাবা ছেলের খোঁজ নেন না, সেই সমাজে নিজের উদ্যোগে যাঁরা বৃদ্ধাদের ভরণ–পোষণ দেন, তাঁদের স্যালুট জানানো ছাড়া বলার ভাষা নেই।

সোহাগি গ্রামের ইউপি সদস্য মোস্তফা মোল্লা বলেন, ‘আমি জনপ্রতিনিধি হয়ে যা করতে পারিনি, ছাত্র অবস্থায় এই সাতজন তা করেছে। ওরা আমাদের এলাকার অহংকার।’

default-image

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রামকৃষ্ণ বর্মণ বলেন, এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। উপজেলা পরিষদ থেকে বৃদ্ধাশ্রমে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা কমিটির সভাপতি আপেল মাহমুদ জানান, প্রতিদিন সকালে ডাল ও আলুছানা ভাত, দুপুরে মাছ কিংবা মাংস এবং রাতে ডিম বা মাছ দেওয়া হয়। সময় কাটানো ও বিনোদনের জন্য দেওয়া হয়েছে এলইডি টেলিভিশন। সবার পেছনে মাসিক ব্যয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। হাত খরচ বাঁচিয়ে, ব্যবসা থেকে ও নিজেদের পকেট থেকে এই খরচের জোগান দিচ্ছেন তাঁরা। বর্তমানে অনেকেই তাঁদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0