পুলিশ ও এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক মোস্তফা জামান সিদ্দিকী (৫৬) এবং গোহাইলবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মৃত বজলু খালাসির ছেলে আলফাডাঙ্গায় কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফ খালাসির (৫৫) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। গত ১৬ এপ্রিল গোহাইলবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনে দুই পক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনে মোস্তফা জামান সিদ্দিকী আবারও বিদ্যালয় কমিটির ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। মোস্তফা ওই ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আহমেদের ছেলে। নিহত ও আহত ব্যক্তিরা মোস্তফা জামান সিদ্দিকী পক্ষের লোক বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ঈদের দিনে জোহরের নামাজ শেষ করে স্থানীয় গোহাইলবাড়ী বাজারে মোস্তফা জামান সিদ্দিকীর দোকানে বসা ছিলেন তাঁর সমর্থকেরা। বেলা দুইটার দিকে আরিফ খালাসির ১০ থেকে ১২ জন সমর্থক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা করেন। এ সময় এলোপাতাড়ি কুপিয়ে সাতজনকে জখম করা হয়। ওই হামলায় দুজন নিহত হন। নিহত দুজন হলেন উপজেলার চরদৈতরকাঠি গ্রামের মৃত হাসেম মোল্লার ছেলে আকিদুল মোল্লা (৪৬) এবং একই গ্রামের মৃত মোছলেম শেখের ছেলে খায়রুল শেখ (৪৫)।

হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চলছেই

ওই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মোস্তফার সমর্থকেরা গতকাল রাতে আরিফের সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করছেন বলে অভিযোগ করেছেন আরিফের সমর্থকেরা।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গোহাইলবাড়ী ও দৌত্যেরকাঠি গ্রামের অন্তত ১২টি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। গোহাইলবাড়ী গ্রামের রবিউল ইসলাম (৫২), মুরাদ মোল্লা (৩২), নূর আলম (২০), জিয়াউর রহমান (৩০) ও দৌত্যেরকাঠি গ্রামের আতিয়ার শেখসহ (৪০) চারটি বাড়িতে হামলা হয়।

আতিয়ার শেখ প্রথম আলোকে বলেন, ২৫ থেকে ৩০ জন মঙ্গলবার রাতে তাঁদের বাড়িতে হামলা করে তাঁদের তিনটি ঘর ভাঙচুর করে। হামলাকারীরা পেঁয়াজ, চাল ও দুটি গরু নিয়ে গেছে। নূর মোল্লা বলেন, হামলাকারীরা তাঁর বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। হামলার ভয়ে তাঁরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে তিনি জানান।

নিহত ব্যক্তিদের পরিবারে মাতম

প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত দুজনের পরিবারে চলছে মাতম। ঈদের আনন্দের পরিবর্তে অজানা ভবিষ্যতের শঙ্কায় পরিবার দুটির স্বজনেরা। নিহত কৃষক খায়রুল শেখের (৪৫) বাড়িতে স্বজনদের বাড়িতে ভারী হয়ে উঠেছ পরিবেশ। খায়রুল এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। তাঁর একমাত্র ছেলে ইয়াছিনের বয়স ১৫ বছর। খায়রুলের মা জরিনা বেগম (৭০) বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই। যারা আমার ছেলেকে ঈদের দিন কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই।’

নিহত খায়রুল শেখের মেয়ে রাবেয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ঈদের দিন আমি শ্বশুরবাড়ি মধুখালী থেকে বাবার বাড়ি গোহাইলবাড়ী আসছিলাম। বাবা আমাকে এগিয়ে আনতে দুপুরে বাড়ি থেকে বের হন। তখন গোহাইলবাড়ী গ্রামের আরিফের অনুসারী আমজেদসহ কয়েকজন আমার বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আমি বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’

default-image

খায়রুলের স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, ‘ঢাল, সড়কি, রামদা, চায়নিজ কুড়াল দিয়ে আরিফের লোকেরা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে।’

খায়রুল শেখের কয়েকটি বাড়ি পরেই নিহত আকিদুল মোল্লার (৪৬) বাড়ি। তিনি এক মেয়ে ও চার ছেলের বাবা। আকিদুলের নির্মম হত্যাকাণ্ডে পরিবার ও প্রতিবেশীরা বাকরুদ্ধ। জন্মের সময় মা মারা যাওয়া আকিদুলের ছোট মেয়ে আছিয়ার বয়স মাত্র দুই বছর। মায়ের আদরবঞ্চিত আছিয়া এখনো জানে না তার বাবাও বেঁচে নেই। চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আজিজের বয়স ১৫ বছর, মেজ ছেলে রিয়াজুলের ১৪ বছর, সেজ ছেলে মমিনের বয়স ১০ আর ছোট ছেলে মোস্তাকিনের বয়স ৭। এতিম এই পাঁচ শিশুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে পড়ায় তাদের ভবিষ্যৎ ও ভরণপোষণের কথা ভেবে নির্বিকার আকিদুলের ৭০ বছর বয়সী অসুস্থ মা সাহেদা বেগম।

সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী সার্কেল) সুমন কর বলেন, দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আজ রাত আটটা পর্যন্ত বোয়ালমারী থানায় কোনো মামলা হয়নি। সন্ধ্যায় লাশ দুটির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর দাবি, এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত।

বিভিন্ন বাড়িতে হামলা ভাঙচুর ও লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন কর বলেন, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। তবে অনেকে হামলার শঙ্কায় বাড়ির জিনিসপত্র সরিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তাঁদের পুলিশ বাধা দেয়নি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন