বিজ্ঞাপন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জেলায় ৮৯৯ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে। আর এসব বাগান থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৬৪১ মেট্রিক টন। এ ছাড়া এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় ও আশপাশের ভিটাবাড়িতে লিচুর চাষ হয়।

সদর উপজেলার গোবিন্দনগর, মুন্সিরহাট, নারগুন, আকচাসহ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বাগানগুলোতে ফল খুব একটা নেই। ফলন বিপর্যয়ের জন্য প্রকৃতির বিরূপতাকেই দায়ী করেছেন কৃষকেরা।

শহরের গোবিন্দনগর এলাকার কৃষক রমজান আলী (৬৭) জানালেন, সাধারণত প্রতিটি গাছে একবার একদিকের শাখায় বেশি ফলন হয়। অন্যদিকে বের হয় কচি পাতা। পরের বছর অপরদিকে বেশি ফলন হয়, এদিকে কচি পাতা। এবার তা হয়নি। প্রায় প্রতিটি বাগানের গাছে মুকুলের বদলে সারা গাছে এসেছে নতুন পাতা। তার ওপর যেসব গাছে মুকুল এসেছিল, প্রচণ্ড খরায় গুটি বের হওয়ার আগেই প্রচুর ঝরে গেছে। তাঁর কথায়, ‘মুকুল ঝাঁটা’ হয়ে গেছে। লিচুর আকারও বড় হয়নি। তাঁর নিজের বাগানে যেখানে প্রায় আট লাখ টাকার লিচু হয়ে থাকে, এবার সেখানে তিন লাখ টাকার লিচুও হয়নি।

পাশে দাঁড়িয়ে কৃষক আনোয়ার হোসেন (৫৭) কথাগুলো শুনছিলেন। তিনি হঠাৎ কথা কেড়ে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, তাঁর তিনটি বাগান আছে। এবার বাগানে লিচুর মুকুল কম এসেছে। যেটুকু মুকুল ছিল, তার অনেকটাই ঝরে গেছে। পরে আবার টিকে থাকা গুটিও ঝরে গেছে। এবার লোকসানের হিসাব করে অনেক কৃষক বাগান পরিচর্যাও ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে আরও বলেন, ‘বাগানগুলো তিন বছরের জন্য ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। গতবার তা শেষ হয়েছে। এবার নিজেই পরিচর্যা করেছি। কিন্তু আমার কপাল এমনই খারাপ যে বাগানে লিচুই ধরল না।’

১২ বছর ধরে ঠাকুরগাঁওয়ে আম-লিচুর বাগান কিনে ব্যবসা করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আজহারুল ইসলাম (৫৫)। তিনি বললেন, এর আগে লিচুর ফলন এত খারাপ হয়নি। এবার অনেক লোকসান হবে।

দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক প্রদীপ কুমার গুহ বলেন, ‘এটা একক কোনো কারণে ঘটেনি। এটা অনেকগুলো কারণের সমষ্টিগত ফলাফল। আমরা গাছ থেকে শুধু ফল নিয়েই যাব, তার যেটা প্রয়োজন তা দেব না, তাতো হয় না। এবার লিচুর ফলন কম হচ্ছে, আকারও ছোট। অত্যন্ত যৌক্তিক কারণে এটা ঘটছে। গাছগুলো সুষম খাদ্য পাচ্ছে না।’

জেলায় প্রায় অনেক বাগানই চুক্তিতে বিক্রি হয়। যাঁরা বাগান নেন, লিচুর মুকুল আসার সময়টাতে তাঁরা পরিচর্যা করেন। আবার ফলন শেষে চলে যান। এর মধ্যে তেমন পরিচর্যা হয় না। পরিচর্যার অভাবে লিচু কমে যাচ্ছে। আর বাগানিরা মৌসুমের শুরুতে নানা ধরনের রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন, যার প্রভাব গাছের ওপর পড়ছে বলে মনে করেন প্রদীপ কুমার গুহ।

এ ছাড়া বিরূপ আবহাওয়াকে লিচুর ফলন কম হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের ওই কর্মকর্তা বলেন, লিচুর পুষ্পমঞ্জরির পরাগায়নের সময় তাপমাত্রা কম থাকা প্রয়োজন। কিন্তু শীত শেষে হঠাৎ গরম পড়ে গেছে। এর কিছুদিন পর হঠাৎ একটানা কয়েক দিন ভোরে কুয়াশা পড়েছে। এর ফলে পরাগায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে আবার খরা চলছে। বৃষ্টি কম হওয়ায় গুটিও ঝরে পড়েছে। এতে ফলের আকারও ছোট হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনো ফসলই এখন আর বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে করা যাবে না। আপনাকে অবশ্যই সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই ফসল আবাদ শুরু করতে হবে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু হোসেন বলেন, এ বছর লিচুর ফলন কম হয়েছে। গাছের উৎপাদনক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। উৎপাদনক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা করতে কৃষকদের সচেতন করছেন বলে জানান তিনি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন