কক্সবাজারের পর্যটকশূন্য ফাঁকা সৈকতে অলস সময় কাটাচ্ছেন লাইফগার্ড কর্মীরা। সৈকতের কলাতলী পয়েন্ট, বুধবার দুপুরে
কক্সবাজারের পর্যটকশূন্য ফাঁকা সৈকতে অলস সময় কাটাচ্ছেন লাইফগার্ড কর্মীরা। সৈকতের কলাতলী পয়েন্ট, বুধবার দুপুরেপ্রথম আলো

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের কলাতলী পয়েন্ট। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা। প্রচণ্ড গরমে সৈকতের তপ্ত বালুচরে পা রাখার জো নেই। বিশাল সৈকতে নেই কোনো পর্যটক। বালুচরের একটি কিটকটে (পর্যটকদের বসার চেয়ার-ছাতা) গোল করে বসে মুঠোফোনে কী যেন দেখছিলেন সমুদ্রে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত কয়েকজন লাইফগার্ড কর্মী। পাশের একটি খুঁটিতে উড়ছে লাল নিশানা। লাল নিশানা ওড়ানোর অর্থ হলো সৈকতে কারও নামা নিষেধ।

লাইফগার্ড কর্মীদের পরনে হলুদ গেঞ্জি। গেঞ্জিতে লেখা সি-সেইফ। চোখে কালো চশমা, মাথায় ক্যাপ, মুখে মাস্ক, গলায় ঝুলছে বাঁশি। সবাই ‘সি-সেইফ’ নামে বেসরকারি একটি লাইফ গার্ড প্রতিষ্ঠানের কর্মী। ফাঁকা সৈকতে বঙ্গোপসাগরে গোসলে নামার কেউ নেই, তবুও কেন রোদে পুড়ছেন—এমন প্রশ্নে হতচকিত খেয়ে গেলেন কর্মীরা। তারপর লাইফগার্ড দলের প্রধান জয়নাল আবেদীন (৩০) বললেন, ‘কী করব? উপায়ও নাই। করোনা সংক্রমণ রোধে সবাই নিরাপদে বাসাবাড়িতে অবস্থান করছেন, আমরা মাঠে চাকরি করছি। সৈকতে গোসলে নেমে ভেসে যাওয়া লোকজনকে উদ্ধার করা আমাদের মূল কাজ হলেও এখন জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় কেউ যেন সৈকতে নামতে না পারেন, সেই দায়িত্ব পালন করছি। নইলে বেতন জুটবে না। বেতন না পেলে সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে।’

মুঠোফোনে লাইফগার্ড কর্মীরা দেখছিলেন ৩০ বছর আগে কক্সবাজার উপকূলে ঘটে যাওয়া ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াল জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কিছু স্থির চিত্র। জলোচ্ছ্বাসে সাগর দ্বীপ কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া ও চকরিয়া উপকূলের হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এখন যদি সে রকম আরেকটি ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাস কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, প্রাণহানি ঠেকানো কিংবা জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় প্রস্তুতি আছে কি না, তা নিয়ে চলছিল আলোচনা-সমালোচনা।

বিজ্ঞাপন

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জয়নাল আবেদীন বললেন, ‘হতাশা যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। করোনা সংক্রমণ রোধে ১ এপ্রিল থেকে সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের সমাগম নিষিদ্ধ করে জেলা প্রশাসন। পর্যটক না থাকায় বিশাল সৈকত ফাঁকা পড়ে আছে। সৈকত এলাকার পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ, ৩০০ রেস্তোরাঁ, তিন হাজারের বেশি দোকানপাট বন্ধ আছে। অর্থনৈতিক সংকটে পর্যটন ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট ৩ লাখ মানুষের জীবন অনেকটা বিপন্ন।’

লাইফগার্ড কর্মীরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসেও এই একটিমাত্র পয়েন্টে (কলাতলী) দৈনিক অন্তত ১০ হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটত। সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সরগরম থাকত সৈকত, চাঙা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতায় হিমশিম খেতে হতো তাঁদের (লাইফগার্ডের)। এখন পর্যটক নেই, পুরো সৈকত ফাঁকা। রোদে পুড়ে অলস সময় পার করতে হচ্ছে।

কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী—এই তিনটি পয়েন্টে পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন সি-সেইফ লাইফ গার্ডের ২৬ জন উদ্ধারকর্মী। তাঁদের মাসিক বেতন ১২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২৩ হাজার ৫০০ টাকা। দৈনিক একাধিক ধাপে (পালাক্রমে) সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত তাঁদের সৈকতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হয়। সন্ধ্যার পর যে কারও সমুদ্রে গোসলে নামা নিষেধ।

সুগন্ধা পয়েন্টে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন লাইফগার্ড কর্মী রশিদ আহমদ (২৮)। তাঁর বাড়ি শহরের সমিতি পাড়ায়। সংসারে মা–বাবা ও চার ভাইবোন। লকডাউনের আগে তাঁর বাবা একটি শুঁটকি মাছ বিক্রির দোকানে চাকরি করে মাসে ১২ হাজার টাকা আয় করতেন। তিনি (রশিদ) চাকরি করে পেতেন ১৪ হাজার ৭০০ টাকা। লকডাউনের কারণে শুঁটকি বিক্রির দোকান বন্ধ থাকায় বাবা বেকার। এখন তাঁর অল্প টাকার বেতনে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে সীমিত আকারে হলেও সৈকতে পর্যটক নামার সুযোগ চান এই লাইফগার্ড কর্মী।
কলাতলী পয়েন্টের ফাঁকা সৈকতে নিজের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে সি সেইফ প্রতিষ্ঠানের আরেক প্রকল্প ‘সুইম সেইফ’–এর প্রশিক্ষক ও লাইফগার্ড আনিসুজ্জামান (২৮) প্রথম আলোকে বলেন, পুরো শহরের হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ব্যবসা–বাণিজ্য কিন্তু এই সৈকতকে ঘিরেই চলে। সৈকতে পর্যটক নেই, সবকিছুতে মন্দাভাব, অচলাবস্থা। একজনের বেতন দিয়ে তো এখন সংসার চলে না।

নেত্রকোনার তরুণ আনিসুজ্জামান ২০১৬ সাল থেকে কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকায় সুইমিং সেইফ প্রকল্পে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষক ছিলেন। পৃথক দুটো সুইমিংপুলে বিনা মূল্যে সাঁতার শেখানো হতো শহরের শিশু শিক্ষার্থীদের। আনিসুজ্জামান নিজেই গত পাঁচ বছরে অন্তত ৪ হাজার শিশুকে সাঁতার শিখিয়েছেন। করোনা সংক্রমণ রোধে এ প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখা হয়। তিনি দায়িত্ব পালন করছেন ফাঁকা সৈকতে। আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্কুল–কলেজ, অফিস–আদালত বন্ধ হলে কর্মকর্তা–কর্মচারীরা বাসায় চলে যান, কিন্তু আমাদের সে সুযোগ নাই। প্রচণ্ড গরমে সৈকত পাহারা দিতে হচ্ছে, যদিও সেখানে কেউ নেই। এখন সীমিত আকারে হলেও সৈকতে কিছু পর্যটকের সমাগম দরকার। নইলে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নেমে আসবে ধস।’

default-image

কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্টহাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ ও কক্সবাজার বিচ কিটকট মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমানের দাবি, সৈকতে পর্যটক না থাকায় অন্তত ৩০ হাজার কর্মজীবী ইতিমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন। তাঁদের বেতন–ভাতা ও ঈদের বোনাস দিচ্ছে না মালিকপক্ষ। রোজার এই সময়ে তাঁরা অনাহারে-অর্ধাহারে অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন। সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে তাঁরা এ পর্যন্ত কিছুই পাননি। গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস সৈকতে পর্যটকের সমাগম নিষিদ্ধ ছিল। এ সময় শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল–মোটেল–রেস্তোরাঁও বন্ধ ছিল।

করোনা সংক্রমণ রোধে সমুদ্রসৈকতে ১ এপ্রিল থেকে পর্যটকের সমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সৈকত এলাকার দোকানপাটগুলো খোলা রাখার সুযোগ আছে। কিন্তু পর্যটক না থাকলে এসব দোকানপাটে বেচাবিক্রি হয় না, এই অজুহাতে সৈকতে পর্যটক সমাগমের সুযোগ চাওয়া ঠিক হবে না বলে মনে করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিন আল পারভেজ। তিনি বলেন, ‘আমরা চাইছি কক্সবাজারকে করোনা ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে। ঝুঁকি কমলে পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন