‘জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাচ্ছি, কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেওয়া হবে।’ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক সালেহ এ কথা বলেই রফিকুল ইসলামকে ঘর থেকে নিয়ে যান। চুয়াডাঙ্গার দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানির রসায়নবিদ আমিনুল ইসলামের ছোট ভাই রফিকুল। আমিনুল ইসলাম জানতেন ভাইকে আর ছেড়ে দেওয়া হবে না। তবু ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাইয়ের সে রাতে ছোট ভাইয়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন।
দর্শনা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে বরিশালে অবস্থান করা রফিকুল ইসলামের স্ত্রী হোসনে আরা বেগমও স্বামীর ফিরে আসার সংবাদ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু রফিকুলের ফিরে আসা হয়নি। স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান পাননি। এর এক বছর পর ১৯৭২ সালের ৩১ জুলাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি আসে হোসনে আরা বেগমের কাছে। বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতির পাশাপাশি রফিকুল ইসলামের মৃত্যুসংবাদ লেখা ছিল তাতে।
সাংবাদিকতা করতেন রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া তিনি একাধারে ছিলেন কলেজশিক্ষক, সাহিত্য ও শিল্পানুরাগী। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী রফিকুল ইসলাম অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধেও। যুদ্ধের শুরুতে ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনায় বড় ভাইয়ের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে।
রফিকুল ইসলামের জন্ম ১৯৩৬ সালে পটুয়াখালী জেলার সদর উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে। স্থায়ী ঠিকানা বরিশাল শহরের বগুড়া রোডে। যে রাতে রফিকুল ইসলামকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যায়, সে রাতে বগুড়া রোডের বাড়িতে ছিলেন রফিকুলের সন্তানসম্ভবা স্ত্রী হোসনে আরা বেগম। তিনি ঢাকার ইডেন কলেজের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। মুঠোফোনে গতকাল রোববার একাত্তরের সে রাতের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল তাঁর কাছে। ভাশুর আমিনুল ইসলামের কাছে থেকে সে রাতের ঘটনা শুনেছেন তিনি। বরাত দিয়ে বলছিলেন, ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় দর্শনা কলেজে শিক্ষকতা করতেন রফিকুল ইসলাম। সেখানে থাকতেন বড় ভাই আমিনুল ইসলামের বাসায়। সে রাতে রফিকুল ইসলাম ছাড়াও বাসাটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন দর্শনা কলেজের অধ্যক্ষ লতাফত হোসেন ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ফজলুর রহমান। ২৯ জুলাই রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের ধরে নিয়ে যান। ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেও পরে আর জীবিত অবস্থায় ছেড়ে দেননি তাঁরা।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকায় টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন রফিকুল ইসলাম। তখন ছাত্রকর্মী হিসেবে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকার রাজপথে যে মিছিল বের হয়, সেখানেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন। পরে বরিশালে ফিরে আসেন। দীর্ঘ সময় পর আবার ভর্তি হন বরিশাল বিএম কলেজে। ছাত্রাবস্থায়ই ১৯৬৪ সালে দৈনিক ইত্তেফাক–এ সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে বিএম কলেজ থেকে বিএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৬৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্র সংসদের নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯ সালে শিক্ষকতা শুরু করেন দর্শনা কলেজে।
ছেলেমেয়ের সঙ্গে হোসনে আরা বেগম এখন ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন। ছেলে তানভীর ইসলাম পেশায় স্থপতি। রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর প্রায় আড়াই মাস পর তাঁর জন্ম। গতকাল মুঠোফোনে তানভীর বলছিলেন, বাবার সঙ্গে তাঁর কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু গৌরব করার মতো স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন তিনি।