default-image

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম নৌপথ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া অনেকটা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। একটি চক্র ফেরিতে জুয়ার আসর বসিয়ে যাত্রীদের টাকাপয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে, পণ্যবাহী বাল্কহেড থেকে চলছে চাঁদাবাজি। ছিনতাইয়ের শিকারও হচ্ছে মানুষ।

ভুক্তভোগী মানুষ ও ঘাট–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাত্রী ও যানবাহন পারাপার এবং নৌপথ নিরাপদ রাখতে দুই ঘাটে স্থাপন করা হয়েছে নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। নৌযানের নিরাপত্তা ও অপরাধ রোধ করতে নৌ-পুলিশের নিয়মিত তদারকির কথা থাকলেও তেমনটি দেখা যায় না। এতে অনেকটা অরক্ষিত থাকায় অপরাধীরা সহজেই অপরাধ ঘটিয়ে কেটে পড়ছে।

দৌলতদিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) আবদুল মোন্নাফ বলেন, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় ১৬ থেকে ১৭টি ফেরি চলে। তাঁর কর্মকর্তাসহ স্টাফের সংখ্যা মাত্র ১৭। সব ফেরিতে কীভাবে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব বলে প্রশ্ন রাখেন তিনি। আবদুল মোন্নাফ বলেন, জুয়াড়িরা সুযোগ পেলে পাটুরিয়া থেকে ফেরিতে ওঠে। তারপরও নৌ-পুলিশের তৎপরতায় কয়েক জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

কুয়াশার কারণে গত সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে পরদিন বেলা ১১টা পর্যন্ত ফেরি বন্ধ থাকায় দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ঘাটে নোঙর করে ছিল বড় ফেরি ভাষাশহীদ বরকত। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক খোকন বিশ্বাস পূর্বাশা পরিবহনে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। ভাষাশহীদ বরকত ফেরিতে উঠলেও ফেরি বন্ধ থাকায় বাসেই বসে ছিলেন। প্রস্রাব করতে বাস থেকে ফেরিতে নেমে দেখেন, ছয় থেকে সাতজন লোক বাতি জ্বালিয়ে জুয়া খেলছে। কাছে এগোতেই জুয়াড়িরা তাঁর মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।

বিজ্ঞাপন
৯ জানুয়ারি রাতে মাগুরা থেকে আসা কাভার্ড ভ্যান ফেরিতে ওঠার সময় কয়েকজন গাড়ির গতিরোধ করে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। দিতে অস্বীকার করলে চালক জহিরুল ইসলাম ও গাড়ির কোম্পানির সেলসম্যান মো. মোস্তফাকে মারধর করে ৩ হাজার ৯০০ টাকা কেড়ে নেয়।

খোকন বিশ্বাস বলেন, অফিসের কাজে ঢাকায় যাওয়া-আসার ভাড়া হিসেবে মানিব্যাগে পাঁচ হাজার টাকা ছিল। ‘ছিনতাই, ছিনতাই’ বলে চিৎকার করে পেছনে দৌড়াতে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। বরং স্থানীয় অনেকেই বলেন, ওদের পেছনে গেলে চাকু ঢুকিয়ে দিতে পারে। পরে রাস্তায় থাকা নৌ-পুলিশকে বললে, তারা কর্ণপাত করেনি।

বাগেরহাট থেকে আসা পণ্যবাহী গাড়ির মালিক রুবেল হোসেন বলেন, ফেরি বন্ধ থাকায় কেবিনে ঘুমানোর চিন্তা করেন। কেবিন থেকে ঘুরে এসে দেখেন, কয়েকজন লোক ফেরিতে বাতি জ্বালিয়ে জুয়া খেলছে। খেলা দেখে তাঁর মনে হয় খেললে অনেক টাকা জেতা যায়। কৌতূহলে প্রথমে তিনি ৫০০ টাকা দিয়ে অংশ নিয়ে হেরে যান। আবারও ৫০০ টাকা দিয়ে খেলে যান। এভাবে কয়েকজন খেলায় অংশ নিয়ে হারেন। একপর্যায়ে সবার টাকাপয়সা কেড়ে নিয়ে দৌড় দেয়। বুঝতেই পারেননি চারপাশে তাদেরই লোকজন।

নিয়মিত এমন জুয়ার প্রত্যক্ষদর্শী দিগন্ত পরিবহনের তত্ত্বাবধায়ক সোহাগ মিয়া বলেন, ‘আগে জুয়া তেমন দেখতাম না। এখন নিয়মিত আসা-যাওয়ার সময় প্রায় রাতেই দেখছি। বিশেষ করে পাটুরিয়া থেকে ফেরি ছাড়লে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ফেরির সঙ্গে লাগিয়ে উঠে বাতি জ্বালিয়ে পাঁচ থেকে সাতজন তাস নিয়ে বসে পড়ে। যাত্রীরা কৌতূহলে খেলায় অংশ নিলে সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে। কেউ খেলা দেখতে দাঁড়ালেও সর্বস্ব হারাচ্ছেন।’

৯ জানুয়ারি রাতে মাগুরা থেকে আসা কাভার্ড ভ্যান ফেরিতে ওঠার সময় কয়েকজন গাড়ির গতিরোধ করে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। দিতে অস্বীকার করলে চালক জহিরুল ইসলাম ও গাড়ির কোম্পানির সেলসম্যান মো. মোস্তফাকে মারধর করে ৩ হাজার ৯০০ টাকা কেড়ে নেয়। পরে অবশ্য জড়িত থাকার অভিযোগে হান্নান শিকদার (২২) ও ফিরোজ প্রামাণিক (২২) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাল্কহেডে চাঁদাবাজির ঘটনা পাবনা অঞ্চলের। এর সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ইতিমধ্যে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মোহা. আবদুল্লাহ আরিফ, নৌ-পুলিশের ফরিদপুর অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার

গত ৩০ ডিসেম্বর নাজিরগঞ্জ থেকে বালু বোঝাই করে ফরিদপুরগামী বাল্কহেড দুর্ঘটনা এড়াতে রাতে দৌলতদিয়ার লালু মণ্ডলপাড়ায় নোঙর করে। পরদিন সন্ধ্যার পর স্থানীয় নিজাম মণ্ডল, জব্বার প্রামাণিক, আলী, মো. শহীদ, মো. হাবিসহ কয়েকজন চালকের কাছে চাঁদা দাবি করেন। দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাল্কহেডচালক আসাদুজ্জামান খান, কর্মচারী মো. মুসা ও মো. বাবুকে মারধর করে টাকাপয়সা কেড়ে নেন। খবর পেয়ে নৌ–পুলিশ হাতেনাতে নিজাম মণ্ডলকে আটক করে।

চালক আসাদুজ্জামান খান বলেন, নৌপথে চাঁদাবাজি দীর্ঘদিন অনেকটা বন্ধ ছিল। সম্প্রতি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় একটি অপরাধী চক্র এভাবে জোরপূর্বক ব্লাকহেডসহ বিভিন্ন নৌযান থেকে চাঁদা আদায় করছে।

নৌ-পুলিশের ফরিদপুর অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মোহা. আবদুল্লাহ আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, বাল্কহেডে চাঁদাবাজির ঘটনা পাবনা অঞ্চলের। এর সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ইতিমধ্যে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফেরিতে জুয়ার বিষয়ে গত রোববার ফরিদপুরে সভা হয়েছে। রাজবাড়ী জেলা পুলিশের কাছে জুয়াড়িদের একটি তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকা পেলেই প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রেপ্তার করা হবে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন