default-image

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সুনামগঞ্জের শাল্লার একটি গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার সকালে উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ ওই গ্রামে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এর আগে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ নোয়াগাঁও গ্রামের গোপেশ দাসের ছেলে ঝুমন দাসকে (২৫) আটক করে।

পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার দিরাই উপজেলা সদরে হেফাজতে ইসলামের একটি সমাবেশ ছিল। এতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হকসহ অন্য নেতারা বক্তব্য দেন। ওই রাতে মামুনুল হককে নিয়ে শাল্লা উপজেলার ঝুমন দাস ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট দেন—এমন অভিযোগ তুলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরের দিন মঙ্গলবার রাতে পুলিশ শাল্লার শ্বাসখাই বাজার থেকে ঝুমনকে আটক করে। ফেসবুক পোস্টের জের ধরে আজ বুধবার সকাল ৯টার দিকে নোয়াগাঁওয়ের আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজন জড়ো হয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে ওই গ্রামে গিয়ে হামলা চালান। এ সময় নোয়াগাঁও গ্রামের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। হামলা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় ওই গ্রামের লোকজন আগেই বাড়িঘর ছেড়ে পাশের গ্রাম ও হাওরে আশ্রয় নেন।

বিজ্ঞাপন

নোয়াগাঁও গ্রামের একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, আজ সকাল থেকে আশপাশের অন্তত চার গ্রামের মানুষ জড়ো হয়ে নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার প্রস্তুতি নেন। এর মধ্যে কাশিপুর, দিরাই উপজেলার নাসনি, চণ্ডীপুর ও সন্তোষপুর গ্রামের লোকজন ছিলেন। হামলা চালিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। কয়েকটি ঘরের জিনিসপত্রও নিয়ে গেছেন হামলাকারীরা। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর মানুষ বাড়িতে ফিরে আসেন। তবে এখনো মানুষজন ভয়-আতঙ্কে আছেন।

খবর পেয়ে শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল মুক্তাদির হোসেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক ঘটনাস্থলে যান। এরপর স্থানীয় লোকদের নিয়ে বৈঠক করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবার সহযোগিতা চান।

নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা জগদীশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘যে ছেলেটি ফেসবুকে আপত্তিকর কথাবার্তা লিখেছে, তাকে আমরাই ধরে পুলিশে ধরে দিয়েছি। তার কঠোর শাস্তি হোক এটা আমরাও চাই। আমরা ভাবতেই পারিনি এরপর গ্রামে হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। মানুষজন চরম ভয়ে আছে।’

শাল্লা সদরের দুজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গতকাল রাতে ঝুটন দাসকে আটকের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে আজ বাজারের দোকানপাট খুলতে নিষেধ করা হয় । সকালে নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার পর শাল্লা সদর বাজারেও হামলার চেষ্টা চালান স্থানীয় আটগাঁও গ্রামের লোকজন। পরে প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়।

শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, ফেসবুকে হেফাজত নেতাকে নিয়ে উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে ঝুমনকে আটক করা হয়েছে। নোয়াগাঁও গ্রামের পরিস্থিতি এখন শান্ত। কয়েকটি ঘরের বেড়া ও আসবাব ভাঙচুর করা হয়েছে। গ্রামে পুলিশ মোতায়েন আছে। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। আটক ঝুমন দাসের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল মুক্তাদির হোসেন বলেন, উপজেলার কয়েকটি জায়গায় উত্তেজনা ছিল। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। র‍্যাব-পুলিশ কাজ করছে। তিনি আশা করেন আর কোনো সমস্যা হবে না। নোয়াগাঁও গ্রামে লোকজনের কী কী ক্ষতি হয়েছে, সেটি প্রশাসন খতিয়ে দেখছে বলে তিনি জানান।

শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা নোয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে জেনেছি, হামলার জন্য লোকজন জড়ো হয়েছিলেন বেশি। পরে অন্য লোকেরাই হামলা করতে বাধা দেন। তারপরও ২০-২৫ জন যুবক গ্রামে ঢুকে ভাঙচুর করেছেন। আমরা পুরো এলাকার মানুষকে নিয়ে বৈঠক করে পরিস্থিতি শান্ত রাখার অনুরোধ জানিয়েছি। এসব বৈঠকে এলাকার আলেম-ওলামারাও ছিলেন। এখন পরিস্থিতি শান্ত আছে।’

দিরাই উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মুক্তার হোসেন চৌধুরী বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি দোষ করেন, তাহলে তাঁকে আইনের আওতায় আনাটা স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এভাবে হামলা–ভাঙচুর হেফাজতে ইসলাম সমর্থন করে না। এটি নিন্দনীয় কাজ। যারা হামলা–ভাঙচুর করেছেন তিনি তাদের শাস্তি দাবি করেন।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন