গাজী আনিসুর রহমান কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি গ্রামের মৃত ইব্রাহীম হোসেনের ছেলে। তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন বলে জানা গেছে। গাজী আনিসুরের মৃত্যুর পর আজ দুপুরে হেনোলাক্স কোম্পানির চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমা আমিনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে নিহত আনিসুরের ভাই নজরুল ইসলাম মামলা করেছেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজী আনিসুর রহমানের কাছ থেকে হেনোলাক্সের চেয়ারম্যান ও তাঁর স্ত্রী মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে ফেরত দেননি। এ কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

গাজী আনিসুরের ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ৩১ মে তিনি ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন। ওই পোস্টেও গাজী আনিসুর নুরুল আমিন ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমা আমিনের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও তিন কোটির বেশি টাকা পাওনার অভিযোগ করেন।

গাজী আনিসুর লিখেছিলেন, ২০১৬ সাল থেকে নুরুল আমিন ও ফাতেমা আমিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ২০১৮ সালে কলকাতায় বেড়ানোর সময় নুরুল আমিন ও ফাতেমা আমিন তাঁকে হেনোলাক্স কোম্পানিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। তিনি প্রথমে অসম্মতি জানালেও পরে তিনি রাজি হন। প্রাথমিকভাবে তিনি এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। পরে তাঁদের পীড়াপীড়িতে আরও ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন বলে গাজী আনিসুর ওই পোস্টে দাবি করেন। এসব অর্থের অধিকাংশই আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। পরস্পরের প্রতি সম্মান ও বিশ্বাসের কারণে তাঁদের অনুরোধে চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি চুক্তি করা হয়নি। পরে চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি চুক্তিপত্র সম্পাদন করার জন্য তিনি বারবার অনুরোধ করলেও ওই দম্পতি গড়িমসি করছিলেন। একপর্যায়ে তাঁরা প্রতি মাসে লভ্যাংশ দেওয়া বন্ধ করে দেন। এমনকি ওই দম্পতির লোকজন তাঁকে নানাভাবে হেনস্তা ও ব্ল্যাকমেল করেছিলেন। ওই সময় লভ্যাংশসহ তাঁর ন্যায্য পাওনা তিন কোটি টাকার বেশি।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া আমলি আদালতে নুরুল আমিন ও ফাতেমা আমিনকে আসামি করে দুটি মামলা করেছিলেন বলে ওই পোস্টে উল্লেখ করেছিলেন গাজী আনিসুর। পোস্টের এক অংশে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি এই প্রতারক দম্পতির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট অনুরোধ করছি।’

গাজী আনিসুরের পরিবার যশোরে থাকেন। তবে তিনি দীর্ঘদিন কুষ্টিয়ায় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। গাজী আনিসুর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তিনি ১৯৯৩ সালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য।

গাজী আনিসুরের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যতটুকু জেনেছি, গাজী আনিসুর রহমানের ব্যবসা–বাণিজ্য ও হতাশার বিষয়ে দলের নেতাদের কাছে কিছু বলেননি। এমনকি পরিবারও কিছু জানে না। একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল। তাঁর পরিবার যদি চায়, তাহলে আইনি বিষয়ে সহায়তা করা হবে।’

গাজী আনিসুরের জেলা ছাত্রলীগ কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মাযহারুল আলম। তিনি বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। মাযহারুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, পরিচ্ছন্ন ছাত্রনেতা ছিলেন আনিস (গাজী আনিসুর) ভাই। ছাত্ররাজনীতি শেষে তিনি চাকরি ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি রাজনীতির শক্তি কোনো সময় ব্যবহার করেননি। তিনি নানা প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। গান–কবিতা লিখতেন। তবে নিজের এত বড় সমস্যার কথা কখনো কারও সঙ্গে শেয়ার করেননি। তাঁর মৃত্যুর খবর নেতা-কর্মীদের ব্যথিত করেছে। একজন প্রকৃত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মীকে দল হারাল।

গাজী আনিসুরের রাজনৈতিক সহকর্মী রাশিদুজ্জামান খান বলেন, ‘গাজী আনিস যখন জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসেন, তখন আমরা তাঁ কর্মী ছিলাম। তিনি প্রচণ্ড সাহসী নেতা ছিলেন। ১৫–২০ জনের মিছিল নিয়েই তিনি মাঠ কাঁপিয়ে দিতেন।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন