default-image

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ফোরকান (৩৬) নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে ফোরকানকে শহরের ফুলতলা বাজারে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি কুপিয়ে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে গুরুতর অবস্থায় তাঁকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে আজ মঙ্গলবার ভোরের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ফোরকান ফুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা।

শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, নিহত ফোরকান দুটি হত্যা, দুটি চাঁদাবাজিসহ পাঁচ মামলার আসামি ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাঁর সঙ্গে একই এলাকার অন্য একটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধ ছিল। প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আধিপত্য বিস্তার নিয়েই ফোরকানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। কাউকে আটক করাও সম্ভব হয়নি। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফুলতলা কাঁচাবাজার এলাকায় সোমবার বিকেলে একদল দুর্বৃত্ত ফোরকানের ওপর হামলা চালায়। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় উপর্যুপরি কোপালে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ফোরকান দুটি হত্যা, দুটি চাঁদাবাজিসহ পাঁচ মামলার আসামি ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাঁর সঙ্গে একই এলাকার অন্য একটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধ ছিল।

ফোরকানের মা শাহানা বেগম দাবি করেন, তাঁর ছেলে ‘খারাপ কাজ’ বাদ দিয়ে ভালো হয়ে গিয়েছিল। দুপুরে ভাত খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে ফুলতলা বাজারে যান। সেখানে বিনা দোষে তাঁকে হত্যার জন্য কুপিয়ে জখম করা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন ‘মজনু বাহিনী’র সদস্যরাই।

একাধিক হত্যা মামলার আসামি ফোরকানের খুনের কারণ জানাতে গিয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, দুই দশক ধরে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল ও ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে ফুলতলা এলাকার চিহ্নিত দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই, খুনোখুনি এবং ‘খুনের বদলা খুন’ প্রতিশোধের খেলা চলছেই।

বিজ্ঞাপন

ফোরকান হত্যাকাণ্ড খুনোখুনি আর বদলার খেলার পরিণতি

পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ফোরকান ছিলেন একসময় ফুলতলা এলাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জেলা যুবলীগের নেতা আমিনুর রহমান শাহিনের অন্যতম সহযোগী। এই শাহিন একসময় ফুলতলা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। গড়ে তুলেছিলেন ‘শাহিন বাহিনী’। সন্ত্রাসী গ্রুপের আরেক অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল শাজাহানপুর উপজেলা যুবলীগের নেতা মজনু মিয়ার হাতে। তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘মজনু বাহিনী’। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শাহিন বাহিনীর হাতে ১৯৯৯ সালের দিকে খুন হন যুবলীগের নেতা মজনুর বাবা শুকুর আলী প্রামাণিক।

পরে সরকারি একটি আমবাগানের দরপত্র নিয়ে বিরোধের জের ধরে ২০১১ সালের ২৪ মে দিনদুপুরে মজনু বাহিনীর নেতা মজনু ও তাঁর লোকজন ফুলদীঘিতে অবস্থিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খাদ্যশস্য উইং) হর্টিকালচার সেন্টারের ভেতরে হামলা চালিয়ে আমিনুর রহমান শাহিনকে হত্যা করেন। ওই ঘটনায় শাহিনের স্ত্রী ইয়াসমিন ববি বাদী হয়ে মজনুসহ ১১ জনকে আসামি করে শাজাহানপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

ফোরকান ছিলেন একসময় ফুলতলা এলাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জেলা যুবলীগের নেতা আমিনুর রহমান শাহিনের অন্যতম সহযোগী। এই শাহিন একসময় ফুলতলা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। গড়ে তুলেছিলেন ‘শাহিন বাহিনী’। সন্ত্রাসী গ্রুপের আরেক অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল শাজাহানপুর উপজেলা যুবলীগের নেতা মজনু মিয়ার হাতে। তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘মজনু বাহিনী’।

এর প্রতিশোধ নিতে ২০১২ সালে ফুলতলা চকতানপাড়া এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় মজনু বাহিনীর সদস্য ও মজনুর ভাগনে ১৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের নেতা শামীম হোসেন ওরফে বুশকে। ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শাহিন বাহিনীর সদস্যরা গুলি করে হত্যা করেন মজনুর আরেক ভাই রঞ্জু প্রামাণিককে। তিনিও শাহিন হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। এরপর শাহিন বাহিনী হামলা চালিয়ে ২০১৩ সালের ২৬ মে শাজাহানপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন সভাপতি আবু জাফরের গণ্ডগ্রাম নয়াপাড়া এলাকার বাসায় উপজেলা যুবলীগের সদস্য মজনু মিয়া ও তাঁর ভাতিজা যুবলীগের কর্মী নাহিদ হাসানকে কুপিয়ে হত্যা করে।

প্রতিশোধ নিতে ২০১৬ সালের ২৯ জুলাই মজনু বাহিনীর হাতে ফুলতলা এলাকায় খুন হন শাহিনের সাবেক বডিগার্ড যুবলীগের ক্যাডার এনামুল হক আকুল। গত বছরের ৫ জুন শাকপালা এলাকায় প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শাহিন বাহিনীর অন্যতম সদস্য এবং বগুড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ ওরফে মিস্টারকে। মজনু বাহিনীর প্রধান মজনু ও ভাতিজা নাহিদ জোড়া হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন আবু হানিফ।

এর মধ্যে শাহিন গ্রুপের সদস্য এনামুল হক হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নাদিম প্রামাণিক এবার বগুড়া পৌরসভা নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি মজনু বাহিনীর প্রধান যুবলীগ নেতা মজনুর ভাতিজা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাতের আশঙ্কা করছিলেন স্থানীয়রা। পুলিশ জানিয়েছে, ফোরকান হত্যাকাণ্ডের পরপরই আত্মগোপন করেছেন নাদিম প্রামাণিক।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন