বরগুনার তালতলী উপজেলার বঙ্গোপসাগরের তিন নদীর মোহনায় একটি যাত্রীবাহী ট্রলার ডুবে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে দুজন। ট্রলারটি গতকাল শুক্রবার দুপুরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আলীপুর বন্দর থেকে বরগুনার বামনা উপজেলার চলাভাঙ্গা পীরের বার্ষিক মাহফিলে যোগদানের জন্য যাচ্ছিল।
গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত ট্রলারটির সাত যাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কোস্টগার্ড ও স্থানীয় জেলেরা এসব মৃতদেহ উদ্ধার করেন। মৃত ব্যক্তিরা হলেন পটুয়াখালীর কুয়াকাটার পাঞ্জুপাড়া গ্রামের জয়নাল আবেদীন (৫২), ট্রলারের চালক কুয়াকাটার আলী হোসেন (৪৫), কুয়াকাটার হারুন আর রশীদ (৬০), কলাপাড়ার আলীপুর গ্রামের সফিজ উদ্দিন (৫০), একই এলাকার নাঈম (১৩), ইউসুফ আলী মাঝি (৪৮) ও মহিপুর গ্রামের আমির আলী (৫৫ )। এ ছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন মুসা মৃধা (১৪), হারুন মুনশী (৪০)। তাঁদের বাড়ি কলাপাড়ার মহিপুর এলাকায়।
সাতজনের মরদেহ গতকাল বিকেলে কলাপাড়া পৌরসভার প্রশাসক আবদুল বারেক মোল্লার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সময় মরদেহ পরিবহনের জন্য প্রতি পরিবারকে বরগুনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। বরগুনা জেলা প্রশাসক মীর জহুরুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
উদ্ধার হওয়া কয়েকজন যাত্রী জানায়, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় এফবি খাদিজা নামের একটি মাছ ধরা ট্রলার পটুয়াখালীর আলীপুর বন্দর থেকে দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে বরগুনার বামনা উপজেলার চলাভাঙ্গা পীরের বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। ট্রলারটি কুয়াকাটার বঙ্গোপসাগর হয়ে বেলা একটার দিকে বরগুনার তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া এলাকাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর মোহনায় ঘোলের কণা এলাকা অতিক্রমের সময় ঘূর্ণিস্রোতের কবলে পড়ে ডুবে যায়।
এ সময় অনেক যাত্রী সাঁতরে এবং জেলেদের সহায়তায় কিনারে পৌঁছাতে পারলেও অনেকে নিখোঁজ হয়। পরে বেলা দেড়টার দিকে স্থানীয় জেলেরা জয়নাল আবেদীনের লাশ উদ্ধার করেন। এরপর কোস্টগার্ডের পাথরঘাটা কন্টিনজেন্টের কমান্ডারের নেতৃত্বে একদল সদস্য বেলা তিনটার দিকে দুর্ঘটনাস্থলে যায় এবং উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। পরে ডুবে যাওয়া ট্রলারটির আশপাশের এলাকা থেকে বাকি ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর ডুবে যাওয়া ট্রলারটিকে রশি বেঁধে অর্ধনিমজ্জিত অবস্থায় কিনারে আনা হয়। এরপর পাম্প লাগিয়ে পানি অপসারণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন কোস্টগার্ড সদস্যরা। পরে পটুয়াখালী থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি ডুবুরি দলকে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। রাত সোয়া আটটার দিকে ডুবুরি দলটি দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
উদ্ধার হওয়া পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর গ্রামের আবদুস শহিদ মৃধা জানান, ট্রলারটির কুয়াকাটা ঘুরে বঙ্গোপসাগর হয়ে বিষখালী নদীতে প্রবেশ করার কথা ছিল। বঙ্গোপসাগর পার হয়ে তিন নদীর মোহনায় (পায়রা-বিষখালী ও বলেশ্বর নদ-নদী) এলে ডান দিকে কিছুটা কাত হয়ে যায়। এরপর যাত্রীরা নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করে। কিন্তু সেটি ক্রমেই দুলতে থাকে এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রলারটি উল্টে যায়।
অন্য এক যাত্রী মোস্তফা নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘দুলতে দুলতে ট্রলারটি মুহূর্তের মধ্যে উল্টে পানির নিচে চলে যায়। এরপর চার-পাঁচ মিনিট পর ওপরে উঠে দেখি, বাঁচাও বাঁচাও বলে অনেকে চিৎকার করছে। আমি সাঁতরাতে থাকি এবং কিছু সময় পর একটি জেলে নৌকার জেলেরা আমাকে এবং আরও কয়েকজনকে উদ্ধার করে কিনারে নিয়ে আসেন।’
সেলিম হাওলাদার ও আবদুস সালাম নামের অন্য দুই যাত্রী জানান, ট্রলারটিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। যাত্রীদের মধ্যে অর্ধেকই ছিল ১২ থেকে ২০ বছর বয়সী। এর মধ্যে মেশিন রুমে ১০-১২ জন যাত্রী ছিল। এসব যাত্রীর অনেকেই বের হওয়ার সুযোগ পায়নি।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মীর জহুরুল হক গতকাল রাতে ঘটনাস্থলে বসে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের তল্লাশি চালানোর পর উদ্ধার অভিযান শেষ করা যাবে বলে ধারণা করছি।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন