বছরে কমছে ১০ হেক্টর জমি

জেলায় ১১১ দশমিক ২৯ হেক্টর জমিতে ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ইটভাটার সংখ্যা ১০১টি হলেও বাস্তবে আরও বেশি। এর মধ্যে অর্ধেকই অনুমোদনহীন।

পাশাপাশি বেশ কটি ইটভাটা। এসব ইটভাটার ধুলা ও কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। সম্প্রতি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যেরবাজার এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

হবিগঞ্জের ধুলিয়াখাল-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কের বৈদ্যেরবাজার থেকে ভুলকোট এলাকার দূরত্ব দেড় কিলোমিটার। এতটুকু দূরত্বে সড়কের দুই পাশে কয়েক বছরে ৩১টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এই সড়কে ঢোকার পরেই চোখে পড়ে ধোঁয়া ও ধুলা। ধোঁয়ার উৎস এলাকার ইটভাটাগুলো। এসব ইটভাটার কারণে কমে যাচ্ছে কৃষিজমি ও দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য।

দেড় কিলোমিটারের মধ্যে ৩১টি ইটভাটা দেশের আর কোথাও আছে কি না, তা জানাতে পারেনি জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপরিচালক মো. তমিজ উদ্দিন খানের ভাষ্য, এসব ইটভাটার কারণে জেলায় প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ হেক্টর কৃষিজমি হারাতে হচ্ছে।

শুধু ধুলিয়াখাল-মিরপুর সড়কই নয়, হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল, শায়েস্তাগঞ্জ, চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলার ইটভাটাগুলোর চিত্র অনেকটা একই রকম। সরকারি হিসাবে জেলায় ইটভাটা ১০১টি হলেও বাস্তবে আরও বেশি। এর মধ্যে অর্ধেকই অনুমোদনহীন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে জেলায় ১১১ দশমিক ২৯ হেক্টর জমিতে ইটভাটা গড়ে উঠেছে। বছরে ৮ থেকে ১০ হেক্টর জমিতে ইটভাটা তৈরি হয়ে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপনের নিয়ম নেই। অথচ আমরা হবিগঞ্জে এই আইনের কোনো প্রয়োগ দেখতে পাই না। যে যেভাবে পারছেন কৃষিজমিতে ইটভাটা গড়ে তুলছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর কৃষিজমির ওপর ইটভাটার ছাড়পত্র দেয় কীভাবে?’

সম্প্রতি সরেজমিনে ধুলিয়াখাল-মিরপুর সড়কে দেখা যায়, দুই পাশে ধানি জমি। এর মধ্যেই ইটভাটার চুল্লি আর চুল্লি। ধোঁয়া আর ধুলার ধূসর হয়ে উঠেছে পরিবেশ। সব ইটভাটাই জিগজ্যাগ কিলন পদ্ধতির। পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড, হফম্যান কিংবা ভ্যার্টিকেল কিলনের কোনো ভাটা চোখে পড়েনি।

সংখ্যার দিক দিয়ে ৩১টি ইটভাটা হলেও প্রায় ১৫টির কোনো প্রশাসনিক অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছেন হবিগঞ্চ সদর উপজেলার মিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফউদ্দিন। সুঘর গ্রামের কৃষক সিদ্দিক আলী বলেন, গ্রামের হাওরে তাঁর এক বিঘা জমি আছে। জমির চারপাশ ঘিরে আছে ইটভাটা। যে কারণে এখন আর তিনি জমিতে কৃষিকাজ করতে পারেন না। তাই বাধ্য হয়ে জমির মাটি বিক্রি করছেন। অপর কৃষক নিতাই গোপ বলেন, তাঁদের এলাকায় জমির দাম কম থাকায় ইট ব্যবসায়ীরা জমি কিনে ইটভাটা গড়ে তুলেছেন।

বাহুবল উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মিরপুর ও আবদুল্লাহপুর এলাকায় এক কিলোমিটারের ভেতরে গড়ে উঠেছে এশিয়া, রয়েল, নিউ মেট্রো, টিটিএন, পলাশ, মামুন, মডার্ন, নিউ সুজাত, ফাইভ স্টারসহ বেশ কিছু ইটভাটা। চিমনিগুলো ১২০ ফুট উচ্চতার হওয়ার কথা থাকলেও কিছু কিছু ভাটায় এমন উচ্চতা চিমনি নেই বলে দাবি করেছেন স্থানীয় মানুষ। এখানে ২০ থেকে ২৫টি ইটভাটা থাকলেও চলতি বছর কেউ নতুন করে নবায়ন করেননি তাঁদের অনুমোদনপত্র। মাঝেমধ্যে প্রশাসন এসব ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করে বন্ধ করে দিলেও পরে তা চালু হয়ে যায়। আবদুল্লাহপুর গ্রামের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কৃষিজমি থেকে ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে মাটি উত্তোলন চলে। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না।

এশিয়া ব্রিকসের মালিক রুবেল মিয়া বলেন, কৃষিজমি থেকে মাটি নিয়ে ইট প্রস্তুত করার কোনো নিয়ম নেই। তবে সরকার যেসব ভূমি থেকে মাটি নেওয়ার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তা ভৌগেলিক দিক দিয়ে সুবিধা নেই। যে কারণে কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

সম্প্রতি হবিগঞ্জ-চুনারুঘাট আঞ্চলিক সড়কের চানভাঙ্গা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তরফ ব্রিকস, ইকরা, তানিসা, এনি, মাহি, রিয়াদ, শোভা, তিতাস, তরঙ্গসহ বিভিন্ন নামে অসংখ্য ইটভাটা। সেখানে কথা হয় চুনারুঘাট চানভাঙ্গা এলাকার কৃষক জাকির মিয়া ও রফিক আলীর সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, কয়েক বছরে অসংখ্য ইটভাটা গড়ে ওঠায় কৃষিজমি এখন হুমকিতে পড়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর হবিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবুল মনসুর বলেন, কৃষিজমির ওপর কোনো ইটভাটার অনুমোদন দেওয়া হয় না। লোকালয়ের বাইরে অনাবাদি জমিতে ইটভাটা করা যায়। তা–ও কৃষি অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০২৫ সালের মধ্যে জিগজ্যাগ কিলন ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়ার। কাজেই নতুন করে ইটভাটার অনুমোদন নিতে হলে সবাইকে নতুন নীতিমালা অনুসরণ করেই নিতে হবে।

জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, কেউ কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ছলচাতুরী করে ইটভাটার অনুমোদন নিলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব সময়ই ইটভাটাগুলোর অনিয়ম দেখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।