default-image

জামালপুর জেলায় প্রথমবার বন্যা হানা দেয় গত ২৫ জুন। এরপর একে একে তিন দফার বন্যায় জেলার বেশির ভাগ মানুষ এক মাস ঘরবাড়িছাড়া। সংসারের সবকিছু জলমগ্ন রেখে বন্যার্তরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সড়কের পাশে ও সেতুর ওপর আশ্রয়ে রয়েছে। তৃতীয় দফায় পানি খুব বেশি না বাড়লেও এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। উপরন্তু চার মাস ধরে করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের আয়–রোজগার নেই বললেই চলে। বন্যা ও করোনার প্রভাবে জেলার ১০ লাখ মানুষের জীবন এখন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

বন্যার কারণে মানুষ যে কত কষ্টের মধ্যে আছে, তা ফুটে উঠেছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া সুখি বেগমের কথায়। তিনি বলেন ‘পত্তি বছর বানে ভাসি। এবারও ভাসিলাম। কত দিন থাইকা ঘরছাড়া। তিনবারের ঢলে পইড়ে গেছি। এক মাস হইল, স্কুলে পইড়ে আছি। বাসাবাড়িতে আন্না-বারির কাজকর্ম কইরা চলছি। করোনার ডরে বাসাবাড়িতে ঢোকতে দেয় না। কত দিন থাইকা কাজকর্ম নাই। মরা চলি কেমবা। তার মধ্যে বানের ঠেলায় কোঠাও বাইর হবার পাই না। চাল ছাড়া কোন্ডাও (কিছুই) নাই। বানের পানি টানও ধরে না। আল্লাহ জানে এবার কী হইব। গরিবগরে (গরিবদের) আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নাই।’

ঘরে পানি থাকায় সুখি বেগমের মতো রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৭০টি পরিবার দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এদের মধ্যে কয়েকজন বলেন, এক মাসের বন্যায় তাঁরা সাহায্য হিসেবে সাড়ে ৮ কেজি করে তিনবার চাল ও একবেলা খিচুড়ি পেয়েছেন। শুধু চাল তো খাওয়া যায় না। চালের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রয়োজন। সরকারিভাবে সেগুলো সরবরাহ করা হয় না। তাঁরা সরকারের কাছে চালের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করার দাবি জানান।

গতকাল সকাল সাড়ে আটটায় দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার ডালবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের ওপর দিয়ে ব্যাপক পানির তোড়। সড়ক ভেঙে গেছে। সেখান থেকে কিছুদূরে উপজেলা ভূমি কার্যালয়। ওই কার্যালয়ে এখনো কোমরসমান পানি। দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের স্টেশন সড়ক, বেলতলী সড়ক ও বাজারে এখনো পানির স্রোত বইছে। সড়কের চারপাশের ঘরবাড়িতেও হাঁটুসমান পানি। হাঁটুসমান পানি ঠেলেই মানুষ যাতায়াত করছে।

পানির তীব্র স্রোত বয়ে যাচ্ছে বেলতলী বাজারের মো. নয়ন মিয়ার গ্যারেজের ভেতর দিয়ে। পুরো গ্যারেজ লন্ডভন্ড। কয়েক মিনিটের পথ পেরিয়ে দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশন। স্টেশনের রেললাইনের ওপর পানি উঠেছে। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

default-image

দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মেও বন্যার্তরা গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্য একজন বাচাতন বেগম। তিনি পৌর শহরের শশাড়িয়াবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। তাঁর ঘরে বুকসমান পানি এক মাস ধরে। ঘরবাড়ির মায়া ছেড়ে এক মাস ধরে তিনি গরু-বাছুর নিয়ে স্টেশনে আশ্রয় নিয়েছেন।

দেওয়ানগঞ্জের আজিমনগরের পুরো এলাকায় এখনো কোমরসমান পানি। বাসাবাড়ি সব খালি। সবাই অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। একই অবস্থা শশাড়িয়াবাড়ি এলাকারও। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে গুজিমারি গ্রামের মানুষ। গতকাল গুজিমারি গ্রামে গেলে স্থানীয় অবিরণ বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানালেন, ‘যমুনার ভাঙনে কয়েক বার সব হারিয়েছি। এখন রেললাইনের পাশে ঘর তুলে থাকি। বন্যায় মরণ হয়েছে। কাজকাম নাই। কেমনে চলি। খাবার নাই। দুইবার চাল পাইছি। চাল দিয়ে তো খাওয়া যায় না। ভাতের সঙ্গে কত কিছু লাগে। সেটা তো নাই। বিয়ান বেলায় আন্নাবারি করি। দিন-রাত কোনো রকম চলে।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন