সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলামের (৬২) ঘরটি বন্যায় পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এখন পরিবারের ছয়জন মানুষ নিয়ে পাশে এটি খুপরি তুলে বসবাস করছেন। সকালে কথা হয় নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'এখন তো খাইয়া না খাইয়া দিন যার। ঈদও আর কিতা খরতাম। নমাজ পইড়া আইছি। আল্লাহে কাছে খইছি, আমরারে এই বিপদ থাকি যেস উদ্ধার করইন।' নুরুল ইসলামের স্ত্রী নূর বিবি (৫১) জানালেন, এবার পিঠা, সন্দেশ কিছুই করা হয়নি তাদের। ঘরে কিছু চাল ছিল, তা দিয়ে ভাত আর ছোট মাছ দিয়ে তরকারি রেঁধেছেন। পাশের ঘর থেকে একজন কিছু পিঠা পাঠিয়েছেন। এগুলো বাচ্চাদের গরম করে সকালে দিয়েছেন। নূর বিবি বলেন, 'আমরার ইবার ঈদ নাই বাবা। বন্যাত সব গেছে। মনও আনন্দ নাই। বড় কষ্টে দিন যার। বাড়তি কোনতা খরমু, এই সামর্থ্যও নাই।'

এই গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আশরাফ আহমদ বলেন, গ্রামের সবাই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। কারও ঘর ভাঙছে, কারও গোলার ধান নষ্ট হয়েছে। সব ঘরেই বন্যার পানি ছিল। অনেকের আসবাব ভেসে গেছে। মানুষ এখনো দুর্ভোগে আছে। অনেকে খেতে পারছে না। চাল নেই। এ রকম সংকটে সুনামগঞ্জের মানুষ আগে কখনো পড়েনি। তাই এবার সুনামগঞ্জে ঈদের আনন্দ তেমন একটা নেই।

একই গ্রামের লোকমান মিয়ার (৫২) ঘরে যখন বন্যার পানি ঢোকে তখন সবাইকে নিয়ে এক কাপড়ে ঘর ছাড়েন তাঁরা। আট দিন ছিলেন গ্রামের স্কুলে। পানি নামার পর এসে দেখেন ঘর খালি, সব ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। লোকমান মিয়া বলেন, ‘শুধু আমি না, পুরা গ্রামেই ঈদের কোনো বাড়তি আয়োজন, আনন্দ নাই। মানুষ চিন্তায় আছে, কিলা ঘর বানাইত, কিলা দুই বেলা ভাত খাইয়া বাঁচত।'

গ্রামের আরেক বৃদ্ধ মুক্তার আলী (৭০) জানান, গতকাল শহরে গিয়েছিলেন। একজন দুই প্যাকেট সেমাই দিয়েছিল। আজ ঈদের সকালে নামাজ পড়ে এসে দুই নাতিকে নিয়ে সেমাই খেয়েছেন। মুক্তার আলী বলেন, ‘সেমাই খাইছি। অউত ঈদ অইগিল। আর কিতা খরতাম। বন্যায় ত সব শেষ। খুঁইজা দেখইন মানুষ কিলা কষ্টত আছে।’ মুক্তার আলী জানান, গ্রামে একটা গরু কোরবানি হয়েছে। বিকেলে হয়তো কিছু মাংস দিতে পারে। পেলে খাবেন, আর না পেলে তো আর মাংস খাওয়া হবে না।

সুনামগঞ্জের এবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাত হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ঈদ করছেন। অনেকের বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ায় তাঁরা এখনো ফিরতে পারছেন না। এখনো জেলার ৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র বন্যার্ত মানুষ আছেন।

সুনামগঞ্জের এবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাত হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ঈদ করছেন। অনেকের বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ায় তাঁরা এখনো ফিরতে পারছেন না। এখনো জেলার ৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র বন্যার্ত মানুষ আছেন।

default-image

শহরের সরকারি কলেজে থাকা পাশের সুলতানপুর গ্রামের বাসিন্দা খালেদা বেগম (৩৪) জানান, তাঁদের বাড়িঘরে এখনো বন্যার পানি আছে। তাই বাড়ি যেতে পারছেন না। ঈদের কোনো বাড়তি আয়োজন নেই জানিয়ে খালেদা বেগম বলেন, ‘তিন বেলা ভাতের জোগাড় করতেই পারতাছি না। ঈদের লাগি আর কিতা খরতাম। সকালে ভাত খাইছি। তাইন (স্বামী) বার অইছইন। যদি মাংস পাইন তাইলে রাইত পুয়া-পুরিরে লইয়া খাইতাম। দিন ত যার গি।’

হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, ‘আসলে বন্যা মানুষকে যে সংকটে ফেলে দিয়েছে, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। সংকটে থাকলে আনন্দ করবে কীভাবে। এবারের ঈদের দিনটায় সেই আনন্দ দেখা যায়নি।

সুনামগঞ্জে সরকারি হিসাবে বন্যায় সুনামগঞ্জে ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সুনামগঞ্জে গত ১৬ জুন থেকে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। অসংখ্য বাড়িঘর, অফিস-আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। সুনামগঞ্জ টানা চার দিন সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এ সময় মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক ছিল বন্ধ। সুনামগঞ্জ পৌর শহরে চার থেকে সাত ফুট পানি হয়। হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নেন বিভিন্ন শিক্ষপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িঘরে। তবে এখনো জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ আছেন। পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ায় অনেকেই বাড়ি ফিরেছেন, আবার যাঁদের বাড়িঘর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তাঁরা ফিরতে পারছেন না। সরকারি হিসাবে বন্যায় সুনামগঞ্জে ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন