default-image

একদিকে শ্যামল ছায়ার কোমল পরশ, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের শোঁ শোঁ গর্জন। পৃথিবীখ্যাত মায়াবী চিত্রল হরিণের দুরন্তপনা, রাখাইন নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনচিত্র, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযুদ্ধ আর বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়ের অপরূপ দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করে।

দক্ষিণাঞ্চলের শেষ জেলা বরগুনার মতো প্রকৃতির এমন বাহারি সৌন্দর্যের সমাহার খুব কম জায়গায়ই মেলে। জেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্য। যাকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্প। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরের তীরের জেলা বরগুনার এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঘিরে দেশের পর্যটনশিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের অভাবে তার বিকাশ ঘটছে না।

বিজ্ঞাপন

শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত

default-image

বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানাবাড়িয়া ইউনিয়নে রয়েছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ স্নিগ্ধ বেলাভূমি শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত। শুভসন্ধ্যা সৈকত ঘিরে এখানে রয়েছে ডিসি পয়েন্ট এবং নিদ্রাসৈকত। জায়গাটি পর্যটকদের ভিন্নভাবে মোহিত করে। সৈকতের একদিকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিশেছে তিনটি নদ-নদী—পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর। অন্যদিকে সুন্দরবনের অংশবিশেষ ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন টেংরাগিরি ইকোপার্ক। শুভসন্ধ্যার বালিয়াড়ির পাশেই রয়েছে ঝাউবন। প্রতিবছর নভেম্বর মাসে জেলা প্রশাসন এখানে রাস পূর্ণিমা উপলক্ষে জোছনা–উৎসবের আয়োজন করে।

টেংরাগিরি বনাঞ্চল

default-image

বঙ্গোপসাগরের কোলে গড়ে ওঠা এই বনে এসে কান পাতলে শোনা যায় সাগরের গর্জন। সাগর থেকে উঠে আসা বাতাসে ছন্দময় অনুরণন তোলে বনের পত্রগুচ্ছ। তালতলী উপজেলার ফকিরহাটে অবস্থিত টেংরাগিরি একসময় সুন্দরবনের অংশ ছিল। প্রাকৃতিক এ বনকে স্থানীয় লোকজন ‘ফাতরা বন’ হিসেবে চেনে। সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায় ১৯৬৭ সালে। তালতলী থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত এ বনের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর ৪ হাজার ৪৮ দশমিক ৫৮ হেক্টর জমি নিয়ে গঠিত হয় টেংরাগিরি বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। রয়েছে ১৩টি রাখাইন পল্লিতে প্রায় দুই হাজার রাখাইন অদিবাসী। তাঁদের পুরোনো স্থাপনা, বুদ্ধমূর্তি তাঁতশিল্প, উপাসনালয়, কাঠের দ্বিতল ঘরবাড়ি।

বিজ্ঞাপন

হরিণঘাটা বনাঞ্চল

default-image

মায়াবী হরিণের দল বেঁধে ছুটে চলা, চঞ্চল বানর আর বুনো শূকরের অবাধ বিচরণ, পাখির কলরবে সারাক্ষণ মুখর থাকে হরিণঘাটা বনাঞ্চল। পাথরঘাটা উপজেলায় বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর তিনটি নদ-নদীর সংগমস্থলে অবস্থিত হরিণঘাটা। সৃজিত এ বনে হরিণ, বানর, শূকর, কাঠবিড়ালি, মেছো বাঘ, ডোরাকাটা বাঘ, শজারু, উদ, শৃগালসহ অসংখ্য বুনো প্রাণীর বিচরণ। সুন্দরবনের চেয়ে আকৃতিতে বড় প্রজাতির মায়াবী চিত্রল হরিণের বিচরণস্থল হওয়ায় এ বনের নামকরণ হয়েছে হরিণঘাটা। দৃষ্টিনন্দন ঘন বন আর সবুজে ছাওয়া হরিণঘাটা বনের সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করেছে পাশাপাশি সুবিশাল তিনটি সৈকত—লালদিয়া, পদ্মা, লাঠিমারা। ৫ হাজার ৬০০ একর আয়তন নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এ বনাঞ্চল। ‘লালদিয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকো ট্যুরিজম সুযোগ বৃদ্ধি প্রকল্প’–এর আওতায় ৯৫০ মিটার ফুটট্রেল (পায়ে হাঁটার কাঠের ব্রিজ) স্থাপন করা হয়েছে। রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার বেঞ্চ, ঘাটলা ও ইটের রাস্তা। মিঠাপানির জন্য খনন করা হয়েছে পুকুর।

মোহনা পর্যটনকেন্দ্র

default-image

বরগুনা জেলা সদরের অদূরে পালের বালিয়াতলী এলাকায় দৃষ্টিনন্দন মোহনা পর্যটনকেন্দ্র। জেলা প্রশাসন মুস্তাইন বিল্লাহর পরিকল্পনায় এ এলাকাকে এক বছর আগে পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দেওয়া হয়। পায়রার বিস্তৃত নদীপাড়কে সিমেন্টের ব্লক দিয়ে বাঁধাই করে বাহারি রঙে রঙিন করে তোলা হয়েছে, যা পর্যটকদের মনকে রাঙিয়ে তোলে। গোধূলির রক্তিম সৌন্দর্যের সন্ধানে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এখানে ভ্রমণ করেন।

জেলার পর্যটনের সম্ভাবনার বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক মুস্তাইন বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বরগুনা দেশের অন্যতম সৌন্দর্যময় এক জেলা। এ জেলার এসব সৌন্দর্য দেশি–বিদেশি পর্যটককে আকৃষ্ট করতে জোছনা উৎসব, ইলিশ উৎসবসহ নানা আয়োজন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয় অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়েছে। ইলিশ আর পর্যটন জেলার নানা অনুষঙ্গ দিয়ে এ অঙ্গনকে মুজিব অঙ্গন নামকরণ করা হয়েছে। দেশের প্রথম নৌকা জাদুঘর করা হচ্ছে এখানে।

মন্তব্য পড়ুন 0