ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমনিতেই দুই বছর ধরে করোনা মহামারির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা। ধারদেনা আর ঋণে জর্জরিত ব্যবসায়ীরা। এই অবস্থার মধ্যে প্রশাসন বিপুল পরিমাণ চাঁদা তোলায় ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে আছেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. শাহীন বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা তোলার বিষয়টি নেজারত শাখা জানে, তাদের সঙ্গে কথা বলুন।’

যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (নেজারত শাখা) মোহাম্মাদ নাজমুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বেচ্ছায় অনুদানের বিষয় আছে, আপনি ডিসি (জেলা প্রশাসক) স্যারের সঙ্গে কথা বলেন, কারণ অফিসটা তাঁর। বিষয়টি তিনি ভালো বলতে পারবেন।’

মুঠোফোনে বরগুনা জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা তোলার বিষয়টি আমার জানা নেই।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা তোলার বিষয়টি আমার জানা নেই
হাবিবুর রহমান, জেলা প্রশাসক, বরগুনা

চাঁদাবাজির এক ভিডিওতে দেখা যায়, বরগুনা ক্লিনিক মালিক সমিতির সহসভাপতি আবু হাসানের কাছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দুজন কর্মচারী চাঁদা নিতে আসেন। টাকা দিতে অপারগতা জানিয়ে তাঁকে (আবু হাসান) বলতে শোনা যায়, ‘এনডিসি স্যারের ফোন নম্বর দেন।’ এরপর এক কর্মচারী এনডিসির নম্বর বের করে দেন। অপর একজন কর্মচারী তালিকা দেখে বলেন, ‘আপনার এক লাখ টাকা। এ সময় ব্যবসায়ী হাসান বলেন, ‘কিসের এক লাখ টাকা? এক লাখ টাকা দেব কোথা থেকে।’ এ সময় ওই অফিস সহকারী বলেন, ‘সেটা আপনার ব্যাপার, গতবার তো নুরুল আমিনের (ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি) মাধ্যমে ৪৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন।’

এরপর ওই ব্যবসায়ী এনডিসিকে ফোন করেন। তবে সেই ফোন রিসিভ না করায় অফিস সহকারী এনডিসিকে ফোন দেন। এনডিসি ওই ফোনের মাধ্যমে ব্যবসায়ী আবু হাসানের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় কথাবার্তার একপর্যায়ে তাঁদের টাকা দিতে রাজি হন ব্যবসায়ী আবু হাসান। এ সময় দুজনের মধ্যে এক অফিস সহকারী বলেন, ‘আল-রাজী ক্লিনিক এবং ডক্টরস ক্লিনিক এই দুটি বাদে অন্য সব প্যাথলজি থেকে আপনি টাকা আদায় করে দেবেন।’

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বরগুনা ক্লিনিক মালিক সমিতির সহসভাপতি মো. আবু হাসান বলেন, তাঁর কাছে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দুই অফিস সহকারী তালিকা দেখিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ সময় তিনি টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে অফিস সহকারী রেজাউল করিম মুঠোফোনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এনডিসি মোহাম্মাদ নাজমুল হাসানের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন।

বরগুনা কালেক্টর মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সুমন শরীফ অভিযোগ করেন, ‘জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে দোকানপ্রতি দুই হাজার টাকা আদায় করে দেওয়ার জন্য বলেছিল। আমি তাদের টাকা দিতে পারব না বলে জানিয়ে দিয়েছি। তাদের কথামতো প্রতিবার ব্যবসায়ীদের হয়রানি করব, এটা সম্ভব নয়। বিষয়টি আমি জাহাঙ্গীর কবির কাকাকে (বণিক সমিতির সভাপতি) জানিয়েছি।’ আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে সমিতির আওতাধীন ৩০১টি দোকান থেকে টাকা তুলে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

জেলা বণিক সমিতির সহসভাপতি জহিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব সংগঠনের কাছেই তারা টাকা চাইছে। তারা সব সময় টাকা নেয়। গত অনুষ্ঠানেও (বিজয় দিবস) টাকা নিয়েছে। সরকারি প্রোগ্রামে তো সরকার টাকা দেয়, তারপরও তারা আমাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে। টাকা না দিলে আবার মোবাইল কোর্টে (ভ্রাম্যমাণ আদালত) ধরে।’

জেলা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক প্রবীণ সাংবাদিক হাসানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন দিবস পালনের জন্য রাষ্ট্রের বরাদ্দ আছে। তারপরও সেটা যদি অপ্রতুল হয়, তবে ব্যবসায়ী সমিতি আছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু অনুদান তুলতে পারে। এটা ইচ্ছার ব্যাপার। কিন্তু সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গণহারে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের নামে এভাবে চাঁদা তোলা, জোরজবরদস্তি করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘এখানে সরকারি কর্মকর্তারা কত টাকা দেন, যদি দিয়ে থাকেন, সেটাও আমাদের জানার অধিকার আছে। এভাবে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে জোর করে চাঁদা তোলা বন্ধ করা উচিত।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন