default-image

গত কয়েক দিন ধরে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের প্রভাবে এবং উজানের বন্যার পানির তীব্র স্রোতে বরিশালের বেশ কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙনের তীব্রতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে রাস্তা-ঘাটা, ফসলি জমি এবং অনেক বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভিটে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। নদী তীরবর্তী মানুষ আছেন চরম আতঙ্কে।


পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বরিশাল সদরের অন্তত ছয়টি স্থানে নদীভাঙন তীব্র হয়েছে। এসব স্থানে বালুভর্তি (জিও) ব্যাগ ফেলে সাময়িক ভাঙন রোধের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। বরিশাল সদরের বেলতলা, চড়বাড়িয়া, লামছড়ি, আটহাজার ও হবিনগর কীর্তনখোলা নদী আর আড়িয়াল খাঁ নদের গর্ভে বিলীন হচ্ছে ইছাগুড়া কালীগঞ্জ বাজার ও গ্রাম।


সরেজমিনে দেখা যায়, বরিশাল সদরের চড়বাড়িয়া ইউনিয়নের লামছড়ি গ্রামটিতে কীর্তনখোলা নদীর ব্যাপক ভাঙন চলছে। গত কয়েক দিনের ভাঙনে চরবাড়িয়া থেকে লামছড়ি যাওয়ার পাকা সড়কটির অন্তত ১৫০ ফুট পাকা রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন চারণ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের বসতভিটা ও লাইব্রেরি এবং আশপাশের গ্রামের মানুষের বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি হুমকিতে রয়েছে। এখানে এর আগে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হলেও একটি চরের কারণে ঢেউ আছড়ে পড়ে ভাঙছে লামছড়ি। একইভাবে বেলতলা, চড়বাড়িয়া, আটহাজার এবং হবিনগর এলাকায়ও কীর্তনখোলার গর্ভে প্রতিদিন বিলীন হচ্ছে নানা কিছু।


চরবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা লালমিয়া ব্যাপারি বলেন, ‘আমরা নদীভাঙনে বসতবাড়ি, সহায়-সম্পদ সব হারিয়েছি। এখন রাস্তার পাশের যে জমিতে মাথাগোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছি, তাও ভাঙনের আশঙ্কায় আছে। গত এক সপ্তাহের ভাঙনে লামছড়ি রাস্তা ভেঙে গেছে। এখন ভাঙন আরও সামনে যাচ্ছে।’


একইভাবে আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে বিলীন হচ্ছে চরমোনাই ইউনিয়নের ইছাগুড়া কালীগঞ্জ এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, গত কয়েক বছরে কালীগঞ্জ বাজার কয়েক দফা ভাঙনের শিকার হয়েছে। নতুন করে বাজার তৈরি করলেও পুরো বাজারটি এবার নদীগর্ভে চলে গেছে। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরের ভাঙনে এই এলাকার কয়েক শ পরিবারের বসতঘর, ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। গত ১৫ দিন ধরে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় এখন প্রতিদিনই নতুন নতুন জমি, স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। ভাঙনের শিকার এসব নিঃস্ব পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে অন্যের জমি ও সরকারি রাস্তার পাশের জমিতে। চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাঁরা।


কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা খোকন মিয়া বলেন, ‘ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি সব নদীতে গ্যাছে। আমরা এহন নিঃস্ব। মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকু নাই। ভাঙনে স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকাই নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।’

এসব এলাকার বাসিন্দারা বলেছেন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক গত ৩১ জুলাই নদী ভাঙনকবলিত এসব এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে এবং স্থায়ী ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের আশ্বাস দেন। কিন্তু ভাঙনের যে অবস্থা তাতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এসব এলাকা রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।


বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাঙনকবলিত এসব এলাকায় সম্প্রতি ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় অনেক পরিবার গৃহহীন ও সহায়–সম্পদ হারিয়েছেন। অসংখ্য পরিবার আতঙ্কে আছে। বিষয়টি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীকে আমরা অবহিত করার পর তিনি এসব এলাকায় যান। নিজের চোখে ভাঙনের ভয়াবহতা দেখেছেন। নদীভাঙন প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী আপদকালীন এবং স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।’


জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. হারুন-অর রশিদ বলেন, বরিশাল সদরের ছয়টি স্থানে নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী। কয়েকটি জায়গায় ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলে আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিছু জায়গায় চর কেটে নদীর অপর পাশের ভাঙন প্রতিরোধ করতে হবে। ভাঙনের তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে কীর্তনখোলা নদীর অনেক জায়গায় বাঁক কেটে সোজা করতে হবে। একইসঙ্গে ছয়টি স্থানে স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধের জন্য প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0