বর্ষায় ভারী বৃষ্টি ও জোয়ার উপচে ডোবে হাসপাতাল

১০ বছর ধরে প্রতি বর্ষায় ডুবছে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠসংলগ্ন এ হাসপাতাল। ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও চিকিৎসকেরা।

চট্টগ্রাম জেলার মানচিত্র

চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতালের কলেবর বেড়েছে দিনে দিনে। ১৪টি অন্তর্বিভাগ ও ২৫টি বহির্বিভাগের মাধ্যমে বেসরকারি এ হাসপাতাল নগরের একাংশের মানুষের এখন বড় ভরসা। কিন্তু ৬৫০ শয্যার এ হাসপাতালের সব সাফল্যের প্রতিকূলে যেন একমাত্র অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে জলাবদ্ধতা। বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের সময় মহেশখালের পানি উপচে পড়লে পুরো এলাকা জলমগ্ন হয়। এ সময় হাসপাতালের নিচতলা থাকে পানির নিচে।

১০ বছর ধরে প্রতি বর্ষায় ডুবছে আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠসংলগ্ন এ হাসপাতাল। তখন চরম ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও চিকিৎসকেরা। হাঁটুপানিতে ভাসে নিচতলার শয্যাগুলো। সর্বশেষ ১ জুলাই এমন চিত্র দেখা গেছে নিচতলার শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, নাক কান গলা বিভাগ, বহির্বিভাগ ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে।

সেদিনের কথা বর্ণনা করে গতকাল সোমবার লাইলি বেগম নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম। তখন নিচতলায় হাঁটুপানি থইথই করছিল। ডাক্তার সাহেব তাই কয়েক দিন পর ভর্তি করাতে বললেন। এরপর রোববার ছেলেকে ভর্তি করিয়েছি।’

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি বিভাগের মেঝেতে টাইলস বসিয়ে আগের চেয়ে উঁচু করা হয়েছে। লোহার তৈরি শয্যা ছাড়া মেঝেতে কিছুই নেই। নার্সদের ডেস্ক দু–তিন ফুট উঁচুতে তুলে রাখা হয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে প্রশাসনিক ব্লকেও। হাসপাতালের পরিচালনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির কক্ষে দেখা গেছে, তাঁর টেবিলটি ইট দিয়ে উঁচু করে রাখা। এই কক্ষের ফ্রিজটি অন্তত দুই ফুট উঁচুতে তুলে রাখা। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম মোরশেদ হোসেন এ সময় কক্ষেই ছিলেন।

এস এম মোরশেদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০ বছর ধরে এভাবেই চলছে। আমরা মেঝে উঁচু করেছি। কিন্তু প্রতিবছরই পানি বাড়ে। প্রতি বর্ষায় কয়েকবার ডোবে হাসপাতালটি। তখন চরম কষ্ট হয়। রোগীও কমে যায়।’ জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর চলমান প্রকল্পের অধীনে মহেশখালের মুখে স্লুইসগেট বসানোর কাজ চলছে। তাতে জলাবদ্ধতার সমস্যা কমবে বলে তিনি আশাবাদী।

গতকাল হাসপাতালটিতে রোগী ছিলেন ৪৩৯ জন। বহির্বিভাগে প্রতিদিন এক হাজার রোগী চিকিৎসা নেয়। হালিশহর, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, গোসাইলডাঙ্গা, চৌমুহনীসহ আশপাশের এলাকার মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। এখানে সরকারি–বেসরকারি বড় কোনো হাসপাতাল নেই।

বেসরকারিভাবে চালানো হলেও অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে খরচ তুলনামূলকভাবে কম। হাসপাতালের পরিচালক মো. নুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘কম খরচে এখানে সব চিকিৎসা করানো যায়। একমাত্র সমস্যা বর্ষার জলাবদ্ধতা। এটা থেকে মুক্তি মিললে হাসপাতালের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।’

হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা

১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্য দিয়ে মা-শিশু হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৮৫ সালে চালু হয় অন্তর্বিভাগ। মা ও শিশুদের চিকিৎসায় অনন্য অবদান রাখা হাসপাতালটি করোনাকালে প্রথম বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে সেবা দিতে এগিয়ে আসে। ৬৫০ শয্যার বাইরে ১৪০ শয্যার করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু রয়েছে। গতকাল সেখানে রোগী ছিলেন ১২৬ জন। এ ছাড়া ১৬টি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রও (আইসিইউ) ছিল ভরা।

৬৫০ শয্যার মধ্যে ৩৫০–এর বেশি শয্যা শিশুদের জন্য বরাদ্দ। কোভিড, নন–কোভিড মিলে ২৬ শয্যার নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র শিশুদের জন্য। নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র রয়েছে ১৪টি। এ ছাড়া হাসপাতালেটিতে দৈনিক অস্ত্রোপচারসহ ২৫টি সন্তান প্রসব হয়।

হাসপাতালের পরিচালক মো. নুরুল হক বলেন, ‘এ হাসপাতাল ধাপে ধাপে এই পর্যায়ে এসেছে। দিন দিন নতুন নতুন বিভাগ চালু হয়েছে। তবে চিকিৎসার মান যেন খারাপ না হয়, সেদিকে আমাদের লক্ষ থাকে।’ হাসপাতালে দৈনিক ৩০টির মতো অস্ত্রোপচার হয়। মোট অস্ত্রোপচারকক্ষ রয়েছে সাতটি। এ ছাড়া রয়েছে নায্যমূল্যের ওষুধের দোকানও।

শিশুস্বাস্থ্য ও প্রসূতি বিভাগও খুব ব্যস্ত থাকে। ১৯৯৭ সালে এখানে ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেন্টার চালু করা হয়। এ ছাড়া ইকো কার্ডিওগ্রাফি বিভাগ, বড়দের আইসিইউ, সিসিইউ, হৃদ্‌রোগ, নিউরোমেডিসিন, নিউরোসার্জারি, গ্যাস্ট্রো–অ্যান্ট্রোলজি বিভাগও রয়েছে। আইসিইউতে খরচ পড়ে প্রতিদিন সাত হাজার টাকা, এনআইসিইউতে পড়ে এক হাজার টাকা। সিজারিয়ানের জন্য খরচ পড়ে ১৮ হাজার টাকা। জরায়ু অস্ত্রোপচার হয় ১৬ হাজার টাকার মধ্যে।

বর্তমানে হাসপাতালটির সামনে একটি ১৩তলা ভবন নির্মিত হচ্ছে। হাসপাতালটিকে ওই ভবনে সম্প্রসারণ করা হবে। তখন মোট শয্যা দাঁড়াবে ৮৫০। এ ছাড়া একটি ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়েছে।

সভাপতি মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘৫০০ কোটি টাকার এই ভবন নির্মাণে আমাদের আরও অর্থ দরকার। যদি নির্মাণ সম্পন্ন হয়, তাহলে ওয়ার্ড সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন পুরোনো ভবনটি কলেজের জন্য ব্যবহৃত হবে।’