আয়রোজগার আর সংসারের কথা তুলতেই রিপন মিয়ার হাসি ম্লান হয়ে আসে। বলেন, ‘বাজারের চাপে জীবনটা চ্যাপটা অইয়্যা গ্যাছে।’ স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে তিনজনের সংসার তাঁর। মেয়ে জান্নাতির বয়স ১৩, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। স্ত্রী অঞ্জনা বেগম পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। থাকেন নগর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে কাশীপুর এলাকায়। যে জায়গায় তিনি সেলাই মেশিন নিয়ে বসেছেন, সেখানে বসতে তাঁকে অগ্রিম জামানত দিতে হয়েছে এক লাখ টাকা। আর মাসে ভাড়া ছয় হাজার। কীভাবে চ্যাপটা হলো জীবন—প্রশ্ন শুনে আঙুলের কর গুনে দেখালেন দিনের ব্যয়।

রিপন মিয়া বলেন, প্রতিদিন ২০০ টাকা দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ৬০, বাড়ি থেকে আসা-যাওয়ার ভাড়া ১০০, দুপুরের খাবার ১০০, চা-নাশতাসহ টুকটাক খাবারে আরও ১৫০ টাকা। সব মিলিয়ে দিনে তাঁর ব্যয় আছে ৬১০ টাকা। এরপর সংসারের ব্যয়, মেয়ের পড়াশোনা, অসুখ-বিসুখের খরচ। আছে প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা ঋণের কিস্তি। পকেট থেকে ২২০ টাকা বের করে দেখালেন। বললেন, ‘এহন বেলা বাজে দেড়টা, আয় অইছে ২২০ টাকা। কন মোরা ক্যামন আছি?’

পরিবারের টানাপোড়েনের কারণে প্রায় ১৫ বছর আগে মেহেন্দিগঞ্জের গ্রামের বাড়ি ছেড়েছিলেন রিপন। তখন বয়স ২০ বছর। ছয় ভাই, চার বোনের মধ্যে রিপন ভাইদের মধ্যে পাঁচ নম্বর। প্রথমে ঢাকায় গিয়ে টেইলারিংয়ের কাজ শিখে ১২ বছর আগে আসেন বরিশালে। এই হকার্স মার্কেটে একটি দোকনে দৈনিক আয়ের একটা অংশ মজুরিতে কাজ নেন। এরপর বিয়ে–থা করে থিতু হন বরিশালে। বললেন, ‘শ্বশুরবাড়ি দিয়া একটু জমি পাইছি। হেইতে কোনো রহম একটু ঘরতুইল্লা মাথা গোঁজার ঠাঁই অইছে। এই তে একটু আছান যে মাস শ্যাষে ঘরভাড়া গুনতে অয় না।’ দুই বছর হলো নিজেই দোকান নিয়েছেন। কোনো দিন এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করেন। আবার কোনো দিন খালি পকেটে বাড়ি ফেরেন। তবে আগে কম আয় করলেও মোটামুটি চলে যেত। এখন আর চলে না। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি। তাই চাপে পড়ে গেছে জীবন। ধারদেনা আর এনজিওর ঋণ দিয়ে এই চাপ সামলান।

রিপন আক্ষেপ করে বলেন, ‘মোগো ঋণ লইয়্যাই মরণ লাগবে। এ ঠালার পানি ও ঠালায়, আবার ও ঠালার পানি এ ঠালায়—এই অইলো আমাগো জীবন।’ রিপন কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা থেকে লাখখানেক টাকার বেশি ঋণ এনেছেন। গত দুই বছরে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আগে এক টাকাও ঋণী ছিলেন না। প্রথম ছিল ২০ হাজার, দুই বছরে তা বাড়তে বাড়তে লাখে ঠেকেছে। শোধ করেন আবার আনেন, এভাবে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ঋণের বোঝা। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা, কিছু জটিলতাও এর মধ্যে দেখা দিয়েছে। রক্তাল্পতার কারণে প্রতি মাসে এক ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। চিকিৎসকের কাছে নেওয়া প্রয়োজন, কিন্তু টাকার জন্য নিতে পারছেন না। নিজের দুর্দশার কথা বলতে বলতে হাসিমুখের সহজ-সরল রিপনের চোখ আর্দ্র হয়ে আসে। বললেন, ‘রাইতে ঘুম আয় না, চউখ (চোখ) ঘুম ভুইল্লা গ্যাছে। জীবন এমন ক্যা?’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন