বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইচলী গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২০ অক্টোবর বিকেলে ভারতের গজলডোবা থেকে হঠাৎ বুকসমান পানি হলকাবেগে আসতে থাকে। মুহূর্তেই তিস্তা নদী ফুলেফেঁপে ওঠে। গ্রামটি তলিয়ে যাওয়া শুরু হয়। লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে যে যার মতো প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে থাকে। পানির তোড়ে ভেসে যায় হাঁস, মুরগি, গরু ছাগল, জামাকাপড়সহ ঘরের জিনিসপত্র।

গ্রামের লোকজনের ভাষ্য, সবাই প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটলেও নওয়াব আলী (নয়া মিয়া) যাননি। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে উঁচু স্থানে রেখে প্রায় বুক পরিমাণ পানি মাড়িয়ে গ্রামের ভেতরে যান বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে। এরই মধ্যে পানির আরেকটা ঢেউয়ে চিরতরে মিলিয়ে যান নওয়াব আলী। তিস্তা ও জীবনের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করা নওয়াবের আর কোনো হদিস মেলেনি। একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী নওয়াব আলীকে হারিয়ে তাঁর স্ত্রী বেগম বানু শিশু দুই সন্তান নিয়ে এখন অকূলপাথারে।

বেগম বানু বলেন, ‘লোকটা (স্বামী) মসজিদের খাদেম ছিল। কোনো জমিজমা নেই। সপ্তাহে মুষ্টির চাল তুলে সংসার চালাত। অভাব নিত্যসঙ্গী থাকলেও দিন শেষে একবার হলেও খাইতে পারতাম। এখন সবটাই শেষ। লোকটা কষ্ট থাইকা নিজে মুক্তি নিল আর দুই ছোট বাচ্চা রাইখা আমারে অভাবের সাগরে ভাসায়ে গেল। এখন কোনো উপায় নেই। আমি নিজে অসুস্থ। কী খাই, বাচ্চাদের কী খাওয়াই! ঠান্ডাও বেড়েছে।’

এই প্রতিবেদকদ্বয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বেগম বানু আঁচলে চোখ মোছেন। তিনি বলেন, ‘নিজের কিছু না থাকলেও লোকটা বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াত। গ্রামে যখন পানি বুকসমান, তখন আমাদের উঁচু জায়গায় রেখে সে (নয়া মিয়া) বলে, “তোমরা থাকো, দেখি গ্রামের ভেতরে মানুষ আটকা পড়ছে কি না।” সেই যে গেছে আর ফেরেনি।’

বেগম বানু বলেন, ‘আমার মেয়েটার (আকলিমার) পড়ার খুব ইচ্ছা। কিন্তু ওর বাপের শক্তি কুলায়নি। ক্লাস এইটে (অষ্টম শ্রেণিতে) পরীক্ষার ফিস ৩০০ টাকা দিবার পারল না। লেখাপড়া বন্ধ হয়া গেল। এখন মেয়েটার বান্ধবীরা যখন স্কুলে যায়, তখন মেয়েটা (আকলিমা) চেয়ে থাকে।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আকলিমা বলে, ‘স্যার, আমি পড়তে চাই। স্কুলে যেতে চাই। বাবা মরে গেছে। আপনারাই আমার মা–বাবা। আমাকে স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। আমি আপনাদের সন্তানের মতো। আমাকে দয়া করেন। তা না হলে আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে।’

মা-মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় ঘিরে ছিলেন প্রতিবেশী সাত-আটজন। এর মধ্যে শিক্ষিত যুবক লাজেম মিয়া (২৪) বলেন, ‘বন্যা রাস্তা ও গ্রামের ঘরবাড়ি তছনছ করে দিয়েছে। এখন আমরা তা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু নয়া মিয়া চাচা পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার কারণে দুই ছোট সন্তান নিয়ে খুব বিপদে পড়েছে চাচি (বেগম বানু)। আমরা গ্রামের লোকজন চাল ও টাকা চাঁদা তুলে চাচার কুলখানি করেছি। কিছু চাল বেচে গিয়েছিল। সেই চাল দিয়ে কষ্টে চলছে দুই সন্তানসহ বেগম বানু। এই চালও শেষ পর্যায়ে। এরপর তারা কী খাবে?’

গ্রামের নুরজাহান বেগম বলেন, ‘নয়া মিয়া চাচা দয়ালু মানুষ ছিলেন। গ্রামে কারও বিপদের কথা শুনলেই ছুটে যেতেন। এখন তাঁর অসহায় বউ–বাচ্চার দিকে তাকালে খুব কষ্ট পাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিস্তার চরের উম্মে কুলসুম স্কুল অ্যান্ড কলেজে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত আকলিমা। ছোট ভাই জিয়ারুল ইসলাম পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে।


উম্মে কুলসুম স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ রিশাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আকলিমা জেএসসি পরীক্ষার ফি দিতে না পেরে স্কুলে আসছে না, সেটা আমার জানা ছিল না। তবে চলতি শিক্ষাবর্ষে জেএসসি পরীক্ষা হবে না।’

স্থানীয় লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘তিস্তায় আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙনে ইচলীর চরের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রাথমিকভাবে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে আবারও দেওয়া হবে। শুনেছি, নওয়াব আলী গ্রামের বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে পানিতে ভেসে গেছেন। এখন দুই সন্তান নিয়ে তাঁর স্ত্রী বিপদে পড়েছেন। চেষ্টা করব সরকারি সহায়তা পেলে তাঁদের দেওয়ার।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন