সমিরুল ইসলামরা চার ভাই দুই বোন। সবার ছোট ভাই ১৯৮৭ সালে মারা যান। সমিরুল সবার বড়। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে নগরের খুলশীতে থাকতেন সমিরুল। মা ও অপর দুই ভাই থাকেন ফিরোজ শাহ কলোনির বাসায়। পরিবারের বড় হিসেবে সব সামলে নিতেন সমিরুল। কিন্তু কোভিড এসে সবকিছু এলোমেলো করে দেয় পরিবারটির।

সমিরুলের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। স্ত্রী মুনা ইসলাম চমেক হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক। কথা উঠতেই তিনি ফিরে গেলেন সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে। ‘প্রথমে মেজ ছেলে (সাবিত) ও তাঁর বাবার জ্বর আসে। দুজন দুই রুমে ছিল। যেদিন হাসপাতালে চলে যাচ্ছে, সেদিন ছেলেকে দূর থেকে দেখে গেছে। আর বাসায় ফিরতে পারেনি।’

বড় ছেলে সাফওয়ান ইসলাম বাবার মৃত্যুর পর বেশি ভেঙে পড়েছিল। এখন সে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছে। বাবাকে নিয়ে কিছু বলতে সে রাজি হয়নি। তবে বাবাকে মিস করে সে। কলেজের কোনো কাগজপত্রে সাফওয়ান বাবার নামের আগে মৃত বা মরহুম লিখতে রাজি হয় না। বাবার অস্তিত্ব যেন প্রতিনিয়ত তার সঙ্গে রয়েছে।

মেজ ছেলে সাবিত ইসলাম অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে সামিরা ছোট। সে ছিল সমিরুলের সবচেয়ে আদরের। সামিরা শুধু বলল, বাবাকে আমি খুব ভালোবাসি।

২০২০ সালে সামিরাদের ঈদটা ছিল খুব কষ্টের। ঈদের সময় বাবা ছিলেন হাসপাতালে। কঠোর নিষেধ ছিল হাসপাতালে দেখতে যাওয়া। বাবাকে আর দেখতেই পারেনি তারা। গত বছরও বাবাকে ছাড়া প্রথম নিরানন্দ ঈদ কেটেছে। তারা দাদির বাসায় গেছে ঈদের পরদিন।

এখন মা ও চাচা সদরুল ইসলাম তাদের বাবার অভাব বুঝতে দেন না। মুনা ইসলাম বলেন, ছেলেগুলো বাবাকে অনুভব করে। কিন্তু মুখ ফুটে বলে না। মেয়েটা বাবার জন্য পাগল। ঈদে জামাকাপড় মূলত আমিই কিনে দিই। সে সময় পেত না।

২০২০ সালে রমজানের সময় সমিরুল আক্রান্ত হয়েছিলেন কোভিডে। হাসপাতাল থেকে ফিরে রোজায় নিয়মিতভাবে স্ত্রী মুনার সঙ্গে বাসায় ইফতার করতেন। এরপর বের হয়ে যেতেন অস্ত্রোপচার করতে। এর আগে রোগীও দেখতেন। স্ত্রী ও শ্বশুরের (মঞ্জুরুল ইসলাম) নিষেধ শোনেননি। এখন এই স্মৃতিগুলো হাতড়ে বেড়ান মুনা ইসলাম।

‘রোগীদের খুব ভালোবাসত সে। শেষ পর্যন্ত রোগী রোগী করেছে। নিষেধ করেছিলাম চেম্বার করতে। সে বলত রোগীরা কোথায় যাবে। চেম্বার ও হাসপাতালের গরিব স্টাফরা তার কাছ থেকে মুঠোভর্তি বকশিশ পেত। বাবুও তাদের কথা ভেবে চেম্বার করত। বলত গরিব স্টাফগুলো ঈদে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। চেম্বার বন্ধ করলে একবারেই বন্ধ করব।’

একটু চুপ করে মুনা আবার বললেন, শেষ পর্যন্ত তার কথাই সত্যি হলো। চেম্বার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন