default-image

গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে আনুমানিক ৫০০ মিটার দূরে নগরীর বরুদা এলাকা। এখানে বরুদা সড়ক ধরে খানিকটা সামনে এগোলে হাতের বাঁয়ে নিহত জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিমের বাড়ি। আধা পাকা ঘরের চারটি কক্ষেই স্বজন-প্রতিবেশী। কেউ বিছানায়, কেউবা বসে আছেন মেঝেতে।
একটি কক্ষে রয়েছেন স্ত্রী শারমিন সুলতানা। স্বামীর কথা মনে হতেই কেঁদে উঠছেন বারবার। সেই কান্না একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে স্বজন-প্রতিবেশীদেরও চোখে।
কয়েকটি গাছপালার ছায়ায় আচ্ছন্ন বাড়িটির উঠানে তখনো বন্ধু, সহপাঠী ও সহকর্মীর ভিড়। বড় ভাই রেজাউল করিম একেক করে কথা বলছেন তাঁদের সঙ্গে। এর মধ্যেই আনিসুলের ছোট্ট শিশুসন্তান সাফরান (৪) খেলা করছে বন্ধুদের সঙ্গে, ছুটছে এদিক-সেদিক। বাড়িতে আসা প্রায় সবারই চোখ আটকে যাচ্ছে সাফরানের এই হাসিখুশিতে। ‘আহা রে, মাসুম বাচ্চা। বাবা বেঁচে নেই, এটা সে এখনো বুঝতে পারছে না। কিন্তু যখন বুঝতে শিখবে, বাবাকে পাবে না, তখন কী হবে?’ কেউ কেউ সাফরানের জন্য ফেলছেন চোখের জল।
আনিসুল করিম গত সোমবার ঢাকার আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে নির্মমভাবে খুন হন। তাঁর দাফন সম্পন্ন হয় গত মঙ্গলবার। কিন্তু মৃত্যুর চার দিন পার হলেও এখনো শোকে কাতর পুরো পরিবার। গতকাল বৃহস্পতিবার শহরের বরুদা এলাকায় আনিসুলের বাড়িতে যেতেই দেখা গেল সেই দৃশ্য।

বিজ্ঞাপন

গতকাল দুপুরে আনিসুলের বাড়ির উঠানে বসে থাকতে দেখা যায় তাঁর কয়েকজন বাল্যবন্ধু ও সহপাঠীকে। আছেন কয়েকজন পাড়াপ্রতিবেশীও। বড় ভাই রেজাউল করিম তাঁদের সঙ্গে আনিসুলের মিলাদ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কথা বলছেন। আর বিভিন্ন ঘরে রয়েছেন আনিসুলের স্বজন ও পরিচিতজনেরা। স্ত্রী শারমিন সুলতানা স্বামীর জন্য কাঁদছেন একটু পরপর। তিনি মানসিকভাবে খুব বেশি ভেঙে পড়ায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। আর বাবা ফাইজউদ্দীনও অকালে ছেলেকে হারিয়ে অনেকটা দিশেহারা। বাড়িতে আসা প্রায় সবার কাছেই চাইছেন দোয়া।
আনিসুলদের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নে। কিন্তু তাঁরা গত ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে বরুদা এলাকায় বসবাস করছেন। এখানেই স্থায়ীভাবে বাড়ি করছেন। তাঁরা চার ভাইবোন। এর মধ্যে আনিসুলই ছিলেন সবার ছোট। আনিসুল ২০০০ সালে গাজীপুর শহরের রানী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০০২ সালে কাজী আজিমউদ্দিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে ৩১তম বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশে যোগ দেন। তিনি সর্বশেষ বরিশাল মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন।

রেজাউল করিম বলছিলেন, মৃত্যুর পর সাফরানকে শেষবারের মতো তার বাবার চেহারাটাও দেখানো হয়নি। তাই সে জানেও না তার বাবার কী হয়েছে। সে শুধু জানে তার বাবা মিটিংয়ে বা অফিসের কাজে বাইরে গেছেন। কাজ শেষ হলেই বাসায় ফিরবেন। তাই কেউ বাবার কথা জিজ্ঞাসা করতেই সে বলে, ‘বাবা মিটিংয়ে গেছে, বাবা আসবে।’ তার মুখে এসব কথা শুনে স্বজন-প্রতিবেশীরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন।
আনিসুলকে মেরে ফেলা হয়েছে অভিযোগ করে রেজাউল বলেন, ‘মানুষের মরণ একদিন আসবেই। যেখানে বা যে সময় মৃত্যু লেখা থাকবে, ঠিক তখনই মৃত্যু হবে। কিন্তু এভাবে আঘাতে বা কোনো ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাওয়াটা খুবই দুঃখজনক, মেনে নেওয়া যায় না। তাঁকে হাসপাতালের কর্মকর্তারা মারধর করেছেন, এটা দেশের সবাই দেখেছেন। আমরা চাই এ হত্যার যেন সঠিক বিচার হয়।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0