আঁখি আক্তার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে অসহায় জীবন পার করছি। অন্যের জমিতে ঝুপরিঘর তুলে থাকি। স্বামীর যা আয়, তা দিয়ে ভরণপোষণেই কষ্ট হয়। ঈদ-উৎসব আমাদের কাছে কষ্ট। সন্তানেরা তো বোঝে না। তারা আবদার করে, আমরা মিটাতে না পেরে নীরবে চোখের পানি ফেলি।’

default-image

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০১৮ সাল পর্যন্ত নড়িয়ায় পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বহু পরিবার এমন নিঃস্ব হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চার বছরের ভাঙনে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে। তাদের অধিকাংশ নড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমি, মানুষের বাগান ও সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। গত চার বছরে অনেকে জমি কিনে বাড়ি করতে পারলেও অধিকাংশ গৃহহীন মানুষ কোনো আশ্রয় না পেয়ে বিপাকে পড়েছে। নড়িয়ার কেদারপুর, মোক্তারেরচর, নড়িয়া পৌরসভার বিভিন্ন স্থানে গৃহহীন পরিবারগুলো জমি ভাড়া নিয়ে ঝুপরিঘরে বসবাস করছেন।

নড়িয়া-জাজিরার পদ্মার ভাঙন রোধ করার জন্য ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তিন বছর যাবৎ পদ্মা নদীর ওই অংশে ভাঙন নেই। কিন্তু নদীভাঙনে গৃহহীন কয়েক হাজার মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়নি। আজ পবিত্র ঈদুল আজহায় এসব গৃহহীন মানুষের বাড়িতে ঈদের কোনো আয়োজন নেই। পরিবারের শিশুদের জন্যও মাংস কিনতে পারেননি অনেকে। অন্য সাধারণ দিনের মতোই তাঁদের কাটছে ঈদের দিনটি।

বিউটি বেগমদের বড় গেরস্ত (কৃষিজীবী) পরিবার ছিল। তিন বিঘা জমিতে বছরে দুই দফা ধান উৎপাদন করা হতো। বাড়িতে গবাদিপশুর খামার ছিল। ২০১৩ সাল থেকে তিন দফা নদীভাঙনে তাঁর পরিবার নিঃস্ব হয়। পাঁচ সদস্যের পরিবারটি আশ্রয় নেয় দক্ষিণ কেদারপুরের একটি বাগানে।

default-image

বিউটি বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাগ্যের কী পরিহাস! আমাদের সংসারে কোনো অভাব ছিল না। আমরা নিজেরাই গরু কোরবানি দিতাম। নদীভাঙনের কারণে পাঁচ-ছয় বছরের ব্যবধানে নিঃস্ব হয়ে এখন অপেক্ষায় থাকি, কখন মানুষ কোরবানির মাংস দেবে। তা সন্তানদের রান্না করে দেব।’

চরজুজিরা গ্রামে পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন শাহাজামাল। নদীভাঙনে তাঁর বসতবাড়ির সঙ্গে কৃষিজমিও বিলীন হয়ে গেছে। মুলফৎগঞ্জ বাজারে চা বিক্রি করে এখন জীবন চালাতে হচ্ছে তাঁকে।

শাহাজামাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘নদীভাঙনের পর কত প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। সবাই আমাদের পাশে থাকবেন। আমাদের খাসজমিতে ঘর তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে অসহায়ভাবে অন্যের জমিতে আছি। কেউ খোঁজ নেয় না। অভাব–অনটনের কারণে এখন আর ঈদে ঘরে কোনো উৎসব–আনন্দ হয় না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ রাশেদউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, নদীভাঙনে আগে যাঁরা গৃহহীন হয়েছেন, তাঁদের আলাদা করে সাহায্য করার কোনো প্রকল্প চলমান নেই। তবে ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে অসহায় মানুষদের ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে, যা নদীভাঙনের শিকার গৃহহীনেরাও পেয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় অনেক মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে, সেখানে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত লোকেদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন