default-image

প্রায় ১২ বছর ধরে ঠাকুরগাঁও শহরের একটি ওয়েল্ডিং দোকানে কাজ করেন মোহাম্মদ বাচ্চু (৪৭)। সেই আয়ে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে দিন কাটছিল তাঁর।

তবে করোনাভাইরাসে লকডাউনের খপ্পরে পড়ে বাচ্চুর কাজও থেমে গেছে। ঘরে বসে থাকলে পেট চলে না। তাই লেবু নিয়ে নেমে পড়েছেন শহরের পথে। তিনি এখন লেবুর ফেরিওয়ালা।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় চলছে লকডাউন। দোকানপাট-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সবই বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে সংসারের চাকা সচল রাখতে নিজের পেশা বদল করেছেন বাচ্চু। বাচ্চুর মতো এমন অনেক শ্রমজীবী নিজেদের পেশা ও ব্যবসার ধরন পাল্টে টিকে থাকার লড়াই করছেন।

গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার কথা হয় ঠাকুরগাঁও পৌর শহরে ঘুরে পেশা বদল করে টিকে থাকা এমন কিছু মানুষের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

শহরের আমতলার চৌরাস্তা মোড়ে (কালীবাড়ি যাওয়ার সড়ক) দেখা যায়, পাটের তৈরি বস্তার ওপর শ দুয়েক লেবু রেখে বসে আছেন বাচ্চু। আর এক নারী তা বেছে দরাদরি করে কিনে নিচ্ছেন। ওই নারী চলে যাওয়ায় পর কথা হয় বাচ্চুর সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ৫ এপ্রিল থেকে নানা ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ জারি করে সরকার। সে সময় বাচ্চুর দোকানে কাজ চলছিল। তবে ১৪ এপ্রিল থেকে চলা ‘সর্বাত্মক লকডাউনে’ দোকানপাট বন্ধ ও অতিজরুরি প্রয়োজন ব্যতীত বাড়ির বাইরে বের হওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে কাজ বন্ধ হয়ে যায় তাঁর। এরপর ঘরে বসেই দিন কাটিয়েছেন তিনি। তবে সঞ্চয়ের টাকা শেষ হওয়ায় আর ঘরে থাকা যায়নি। স্থানীয় পাইকারি সবজি বাজার থেকে লেবু কিনে শহরের সড়কে সড়কে বিক্রি করতে শুরু করেন তিনি। আগে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় ছিল। আর এখন আয় দেড় থেকে ২০০ টাকা। এই আয়ে সংসার না চললেও জীবন বেঁচে যাচ্ছে।

আলাপ শেষে বাচ্চু বললেন, ঘনিষ্ঠ যাঁরা সবারই কষ্টে দিন কাটছে। কার কাছে হাত পাতবেন। তাই এই পেশা বেছে নিছি।

শহরের নর্থ সার্কুলার সড়কের টেইলার্সের পাশে একটি সুতার দোকানে কাজ করতেন মো. সোহেল (৪৩)। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। লকডাউনে দোকান বন্ধ থাকায় তাঁর আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় দোকান খুলতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্কতায় তা পারেননি। গত রোববার থেকে তিনি শসা, লেবু, গাজর, বেল ও খেজুর বিক্রি শুরু করেন। তিনি বললেন, কোনো কোনো দিন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ হয়। আবার কোনো দিন মাল থেকে যায়। কী করব, বসে থাকার চেয়ে যা আসে সেটাই অনেক।

আবদুল হক (৪৯), রণজিৎ রায়ও (৫৩) শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। বাধ্য হয়েই স্টেশন রোড এলাকায় মাস্ক বিক্রি শুরু করেছেন। তিনি বলেন, শুরুতে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মাস্ক বিক্রি হলেও এখন তা কমে এসেছে।

শহরের ঘুরে ঘুরে রিকশা ভ্যানে মসলা মেশানো পেয়ারা, আমড়া, শসা বিক্রি করতেন ইসমাইল উদ্দিন (৩৯)। এখন আর কেউ এসব খাবার খায় না। কয়েক দিন ঘরে বসে থেকে গত মঙ্গলবার থেকে তিনিও মাস্ক নিয়ে বের হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি বললেন, এভাবে কি জীবন চলে?

শহরের আর্ট গ্যালারি মোড়ে শতাধিক মানুষের জটলা। কাছে গিয়ে বোঝা গেল তাঁরা সবাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় দক্ষিণে ধান কাটতে যাচ্ছেন। দিন পনেরো ধান কাটা শেষে আবার ফিরে আসবেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন রমজান আলী, সোহরাব উদ্দিন, প্রদীপ রায়কে দেখা গেল। তাঁরা সবাই শহরে রিকশা চালান।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন