নিহত তানজিনা আক্তার রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার চিথলী এলাকার আবদুল জলিলের মেয়ে। গ্রেপ্তার রাসেল একই উপজেলার এনায়েতপুর এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে। তানজিনার মরদেহের হাড় উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর বাবা আবদুল জলিল ও মা সাহারা বানু কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁরা রাসেলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

default-image

ব্রিফিংয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের ৫ এপ্রিল বাড়ৈভোগ এলাকার ডোবা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় তরুণীর বিচ্ছিন্ন মস্তক উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় হত্যা মামলা করে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই। দায়িত্ব পেয়ে প্রযুক্তির সহায়তায় ১১ মাস পর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার এনায়েতপুর এলাকা থেকে নিহত তানজিনার কথিত স্বামী রাসেলকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আসামি রাসেল তানজিনার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল দাবি করলেও এমন কোনো তথ্য–প্রমাণ এখনো আমরা পাইনি। তাঁর দাবি অনুযায়ী বিয়ের পর রাসেলের মৃত বোনের স্বামী মোস্তফাসহ কয়েকজনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলা নিয়ে তানজিনাকে সন্দেহ করেন রাসেল। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়।’

জিজ্ঞাসাবাদে তানজিনাকে হত্যা কথা স্বীকার করেছেন রাসেল। দেখিয়ে দিয়েছেন লাশ গুম করার স্থানও। সেই তথ্যমতো পিবিআই আজ বৃহস্পতিবার একটি ডোবা সেচে তানজিনার খণ্ডিত দেহাবশেষের ১৯ টুকরা হাড় উদ্ধার করেছে।

পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাসেল স্বীকার করেছেন, গলাকাটা মাথাটি তানজিনার। এইচএসসি পাস রাসেল জীবিকার তাগিদে নারায়ণগঞ্জে রনি নিট গার্মেন্টসে চাকরি নেন। এ সময় তাঁর গ্রামের বাড়ির এলাকার তানজিনার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু রাসেলকে তানজিনার পরিবার মেনে নেয়নি। এসব নিয়ে মনোমালিন্যের একপর্যায়ে ২০১৯ সালে রাসেল মোনালিসা নামের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। ওই বিয়ের সংবাদ শুনে তানজিনা তাঁর পরিবারের সঙ্গে কলহ করে রংপুরের বাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন এবং গার্মেন্টসে চাকরি নেন। এ সময় রাসেলের সঙ্গে তানজিনার আবার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাসেল ও তানজিনা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে শহরের দেওভোগ পশ্চিম দেওভোগ আদর্শ নগর এলাকায় নোয়াব মিয়ার বাড়ির তৃতীয় তলায় বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরু করেন।

default-image

পিবিআই জানায়, গত বছরের ২৯ মার্চ শবে বরাতের রাতে নামাজ শেষে রাত তিনটার দিকে বাড়ি ফিরে তানজিনাকে মুঠোফোনে কথা বলতে দেখে রেগে মারধর করেন রাসেল। একপর্যায়ে রাসেল ক্ষিপ্ত হয়ে বঁটি দিয়ে গলায় কোপ দিলে রক্ত বের হয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন তানজিনা। পরে বঁটি দিয়ে গলা থেকে তানজিনার মাথা কেটে আলাদা করে ফেলেন এবং হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ১০ টুকরা করে ফ্রিজে রেখে দেন। ওই দিন তানজিনার দেহের খণ্ডিত অংশ বাড়ির ছাদ থেকে পাশের ময়লার স্তূপে ফেলে দেন। ৪ এপ্রিল তানজিনার খণ্ডিত মাথা একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে করে শহরের পশ্চিম দেওভোগ এলাকার একটি ডোবার মধ্যে ফেলে দেন।

ঘটনার পর রাসেল বাসা ছেড়ে হাঁড়িপাতিল ও হত্যার কাজে ব্যবহৃত বঁটি নিয়ে গোপনে পালিয়ে যান এবং সোনারগাঁর সাদিপুর এলাকায় একটি টিনশেড ভাড়া নেন। আত্মীয়স্বজন তানজিনার খোঁজখবর না পেয়ে তাঁর ভাগনে পলাশ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ওই জিডির সূত্র ধরে থানা থেকে রাসেলকে ফোন দিলে তিনি সোনারগাঁ থেকে পালিয়ে যান এবং মুঠোফোন বন্ধ করে দেন। রাসেল বিভিন্ন সময় নামে-বেনামে ২৫টি মুঠোফোন সেট ও ১৫টি সিমকার্ড ব্যবহার করেন। বারবার তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকেন।

গ্রেপ্তারের পর রাসেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বঁটি, লাশ সংরক্ষণকাজে ব্যবহৃত ফ্রিজ এবং তানজিনার ব্যবহৃত মুঠোফোন রাসেলের বোনের হেফাজত থেকে জব্দ করে পিবিআই। রাসেলের দেখিয়ে দেওয়া স্থান ওই ডোবার পানি দুই দিন ধরে সেচে তানজিনার দেহের খণ্ডিত ১৯ টুকরা হাড় উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, হাড়গুলো ভেঙে টুকরা বেড়েছে।

পিবিআই পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, তানজিনার মা–বাবার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। উদ্ধার মরদেহের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করে মেলানো হবে। রাসেল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রকৃত কী কারণে তানজিনাকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন