হাতের কাজ দিয়ে আমাদের সম্প্রদায়ের গরিব, কম আয়ের এই মানুষগুলোর যদি আমার শরীরের পরিশ্রমে কিছু উপকার হয়, তাতে মন্দ কী? মানুষ তো মানুষের উপকারে আসবে—এইটাই নিয়ম, নাকি?
পারভেজ

যে তরুণের চুল কাটা হচ্ছিল, তাঁর বয়স ২৭ কি ২৮ বছর হবে। নাম শাহিন খান। তিনিও পেশায় জেলে। সেখানে সগির মিয়া, শাকিল, পাভেল, আবদুর রহিম আরও অনেকে অপেক্ষায় আছেন, চুল কাটাবেন। কাল মঙ্গলবার ঈদ, তাই সবাই পারভেজের কাছে চুল কাটার জন্য এসেছেন। পারভেজ সকালে নদীতে জাল ফেলেছেন। বেলা আড়াইটায় জাল তুলবেন। তাই এই ফুরসতে লেগে পড়েছেন ছোট্ট একটি কাঁচি আর ব্লেড নিয়ে সবার চুল কাটার কাজে। তার মধ্যে এক কিশোর যার বয়স ১৪ বছর হবে, তার রাহুল কাট দিতে হবে ঈদ উপলক্ষে। এরা সবাই জেলে পরিবারের সদস্য।

পারভেজ একে একে চুল কেটে চলেছেন একেক জনের। জেলে শাহিন খান বলেন, ‘আমরা চুল কাটাতে বাজারে যাই না। চুল বড় হলেই ওর কাছে আসি। অনেক যত্ন নিয়ে আমাদের সবার চুল কেটে দেয়। সবাই ওর দ্বারা উপকৃত হয়। কোনো পারিশ্রমিক নেয় না।’

বড় লোকের (বিত্তশালী) মতন নিজে ভালো থাহার স্বার্থ এইহানে কেউ দ্যাহে না। পারভেজ হেইয়্যার পেরমান (প্রমাণ)।
সগির হোসেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব জেলে

কাজের ফাঁকেই পারভেজের সঙ্গে আলাপ হলো। কীভাবে রপ্ত হলো এই চুল কাটার দক্ষতা, কেন তিনি সবার বিনা পয়সায় চুল কেটে দেন—এ রকম অনেক প্রশ্ন। মনোযোগী পারভেজ কাজের ফাঁকে ফাঁকে বলেন, ‘দেখেন, এখানে সবাই গরিব। চুল কাটাতে যেতে হয় অন্তত ৭ কিলোমিটার দূরে বরগুনা শহরে। তার ওপর পথের যে অবস্থা, তা তো দেখেনই। যেতে-আসতে গাড়ি ভাড়া, শরীরের খাটুনি, সময় এবং এরপর চুল কাটার জন্য পারিশ্রমিক—সব মিলিয়ে এক দিনের পরিবারের খরচ চলে যায় একজনের চুল কাটাতে। আমি দেখে দেখে এই কাজটা শিখেছি। তাই হাতের কাজ দিয়ে আমাদের সম্প্রদায়ের গরিব, কম আয়ের এই মানুষগুলোর যদি আমার শরীরের পরিশ্রমে কিছু উপকার হয়, তাতে মন্দ কী? মানুষ তো মানুষের উপকারে আসবে—এইটাই নিয়ম, নাকি?’ পারভেজের সরল প্রশ্ন।

জেলে সগির হোসেন (৫২) বলেন, ‘এই যে গ্রামডা দ্যাহেন, এই হানে সবাই গরিব। মাছ-পোনা গাঙ্গে পাইলে পরিবারের খাওন চলে, না পাইলে ধার-দেনা কইর‌্যা দুমুঠো কোনোরহম খায়। কিন্তু এইহানের মাইনসের অভাব থাকতে পারে কিন্তু মোগো একজনের আরেকজনের উফরে আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নাই। বড় লোকের (বিত্তশালী) মতন নিজে ভালো থাহার স্বার্থ এইহানে কেউ দ্যাহে না। পারভেজ হেইয়্যার পেরমান (প্রমাণ)।’

পারভেজ, শাহিন খান, আবদুর রহিম, পাভেল, শাকিল, সগির হোসেন—তাঁদের মুখে ঈদের আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল। বিষখালীতে তখন ভাটিতে টান পড়েছে। দূর থেকে এক জেলে জোর গলায় ডাকছিল, ‘এ তোরা কোম্নে সবাই, গাঙ্গে টান দেছে, যাবি না...।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন