বিনিয়োগে স্থবিরতা ও উত্তরণের উপায়

৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪, প্রথম আলোর আয়োজনে ‘বিনিয়োগে স্থবিরতা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো।
সহযোগিতায় ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ

আলোচনায় সুপারিশ
 গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, ব্যাংকের তারল্য, খেলাপি ঋণের পরিমাণ, সুদের হার—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় না আনতে পারলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
 সরকার সাতটা জোনের মধ্যে যদি একটা একটা করেও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জমির ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলেও বিনিয়োগের অভাব হবে না।
 বিদ্যুৎ, গ্যাস, জমিকে এক ছাদের নিচে এনে সমন্বয় করতে হবে। এটা কখনো হয়নি।
 সরকারি ব্যাংকগুলোকে অবিলম্বে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে।
 বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন হলে সংসদীয় কমিটি হবে। সংসদে একটা সেশনে আলোচনা হতে পারে।

আলোচনা
মতিউর রহমান: প্রথম আলো সংবাদপত্র থেকেও একটু বেশি। দৈনিক ৫০ লাখ পাঠক প্রথম আলো পড়েন। ২০৩টি দেশ থেকে প্রথম আলো পড়া হয়। আমরা একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু রোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
দেশের অগ্রগতির জন্য আমাদের আরও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। যেকোনো দেশের উন্নয়নের জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে এ মুহূর্তে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ খুব জরুরি। সেই অর্থে বাংলাদেশে এখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ তেমন নেই। ফলে দেশের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি ভবিষ্যতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একটি বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে যা যা করা দরকার, সেসব ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে উদ্যোগ নিতে হবে।

আব্দুল কাইয়ুম: বাংলাদেশে সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও বিগত বছরগুলোতে দেশের বিনিয়োগ ও আর্থিক খাত মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। বর্তমানে দেশে তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই উদ্যোক্তারা বিনিয়োগমুখী হচ্ছেন না।
ব্যাংকে দিন দিন অলস অর্থ বাড়ছে। যেমন এ বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকে অলস অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন হাজার একচল্লিশ কোটি টাকা। এটা ২৭ মার্চ কমে হয় প্রায় দুই হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ২৮ এপ্রিল কিছুটা বেড়ে হয় তিন হাজার ২৪ কোটি। আবার ২৯ মে কমে হয় দুই হাজার ৭৬১ কোটি। ৩০ জুন বেড়ে হয় তিন হাজার ১৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকে কম–বেশি তিন হাজার কোটির মতো অলস টাকা জমে আছে। আলোচনায় এসব বিষয় আসবে। এখন আলোচনা করবেন আলী রেজা ইফতেখার

আলী রেজা ইফতেখার
আলী রেজা ইফতেখার

আলী রেজা ইফতেখার: আমরা দু-এক মাস পর পরই দৈনিক পত্রিকা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয়ে আলোচনা করি। বিনিয়োগই হচ্ছে ব্যাংকের সাফল্যের মাপকাঠি। বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি না হলে ব্যাংকে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশে তিন ধরনের ব্যাংক আছে—বেসরকারি, সরকারি ও বিদেশি ব্যাংক। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারছে। এটা একটা ভালো দিক। বেসরকারি ব্যাংকে কোনো স্থবিরতা নেই। তবে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। ব্যাংকের লাভ নিয়ে অনেক কথা হয়। আমরা শেয়ারহোল্ডারদের একটা গ্রহণযোগ্য লভ্যাংশ দিতে চাই। লাভ না হলে সেটা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়। ব্যাংকের ক্ষেত্রে পৃথিবীতে এ হার সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকের অপারেটিং প্রফিট বেশি হলেও প্রভিশনসহ সবকিছু বাদ দিয়ে ২০ শতাংশের বেশি আসল লাভ থাকে না। আমরা একেবারে খারাপ অবস্থায় নেই। তবে আরও প্রবৃদ্ধি আশা করি। আলোচনায় অনেক পরামর্শ আসবে। এসব পরামর্শমতো কাজ করার চেষ্টা করব।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: কোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে তার ধরন বুঝতে হবে। ২০১২ সালের শুরু থেকেই সমস্যার শুরু। গত তিন বছরে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। যেমন ২০১২ সালে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের পরিমাণ ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৩ সালে ২১ দশমিক ৭ শতাংশ ও ২০১৪ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে এ সময়ে রাষ্ট্র খাতের বিনিয়োগ বেড়েছে। যেমন ২০১২ সালে রাষ্ট্র খাতের বিনিয়োগ ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৩ সালে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৪ সালে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৪-১৫ সালে রাষ্ট্র খাতের বিনিয়োগ না বাড়লে সামগ্রিক বিনিয়োগ শঙ্কার মুখে পড়বে।
ব্যক্তি বিনিয়োগের ঋণপ্রবাহ গত বছর গত দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল। এখন কিছুটা বাড়লেও এ বছরের জুন পর্যন্ত এর পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুসারে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হওয়ার কথা ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এখনো ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ দশমিক ২ শতাংশ কম। ২০১১ সালে বিনিয়োগ বোর্ডে ৯৯ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছিল। ২০১২ সালে নিবন্ধন হয়েছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। ২০১৩ সালে ৬৭ হাজার কোটি টাকা এবং ২০১৪ সালে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত চার বছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে। বিনিয়োগ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি দুই বিনিয়োগই কমেছে। ২০১৩ সালে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে। ২০১৪ সালে আবার কমে হয়েছে ১ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যান্য দেশের তুলনায় এটা খুবই কম বিদেশি বিনিয়োগ।
দুশ্চিন্তার কারণ হলো, প্রায় ১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে গেছে। এর মধ্যে ৫৩০ মিলিয়ন ডলার মুনাফা হিসেবে এবং ৮৪১ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার ও এনার্জি কোম্পানি নিয়েছে। তিন প্রান্তিকে মেয়াদি ঋণ কমেছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। মেয়াদি ঋণ শিল্পঋণ কি না, সেটা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। আমদানিতে ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে আমদানি তথ্য অগ্রহণযোগ্য। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তারল্য ছিল ৯৫ হাজার কোটি টাকা। জুন মাসে হলো ১৪৩ হাজার কোটি টাকা। ছয় মাসে কীভাবে ৫০ হাজার কোটি টাকা বেশি তারল্য হলো? প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৪ সালের জুনে এর পরিমাণ ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যাংক খাতে বাংলাদেশে ইতিহাসে সর্ববৃহৎ নৈরাজ্য হয়েছে। এর পরিমাণ ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এ নিয়ে গবেষণা হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখন এমন একটা পরিস্থিতি—ব্যাংকে তারল্য বাড়ছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, সুদের হার বাড়ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, ব্যাংকের তারল্য, খেলাপি ঋণের পরিমাণ, সুদের হার—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় না আনতে পারলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

এ কে আজাদ
এ কে আজাদ

এ কে আজাদ: বর্তমানে সব ক্ষেত্রে আস্থার সংকট রয়েছে। কিছুদিন আগে সরকারের প্রতি ব্যবসায়ীরা বিরূপ মনোভাব দেখিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বিনিয়োগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ শতাংশ। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এটা মাইনাস ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে শিল্পে কাঁচামাল আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ শতাংশ, এ অর্থবছরে মাইনাস ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু ক্লাসিফাইড ঋণ হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে কেন? যেমন: ২০১১, ১২, ১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং এ বছর জুলাই পর্যন্ত ক্লাসিফাইড ঋণ ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ১২ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য অনেক ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা এখনো চাহিদামতো ঋণ পাচ্ছে না এবং ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনো কেটে যায়নি। মানুষের মনে এখনো শঙ্কা রয়েছে। কখন কী হয়, অনেকেই এই অনিশ্চয়তা দূর করতে পারছেন না। এত কিছুর পরও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মোটামুটি ভালো। আমি মনে করি, শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও দেশ এগিয়ে যাবে, যদি গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। সাত বিভাগে সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করেছে। কিন্তু এর কাজ খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে। সরকার সাতটা জোনের মধ্যে যদি একটা একটা করেও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জমির ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলেও বিনিয়োগের অভাব হবে না। দেশে মূলধনের ব্যয় অনেক বেশি। এখানে সুদের হার ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ। অথচ প্রতিবেশী দেশে ৮ থেকে ৯ শতাংশের বেশি নয়। আমরা দেশি বিনিয়োগকারীরা প্রস্তুত আছি। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও মূলধনের স্বল্প ব্যয়ের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

আফতাব উল ইসলাম
আফতাব উল ইসলাম

আফতাব উল ইসলাম: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য কিছু বিষয়কে বিদেশি বিনিয়োগের বাধা মনে করা হয়। আমি এর সঙ্গে একমত নই। গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর—এগুলোই বরং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ হতে পারে। গত দেড় থেকে দুই বছর বিদেশি বিনিয়োগ না আসার প্রধান কারণ হলো অনিশ্চয়তা। বিওআইয়ের (বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট) ক্ষমতাগুলো বর্তমানসহ আগের চেয়ারম্যানরা ব্যবহার করেননি। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জমিকে এক ছাদের নিচে এনে সমন্বয় করতে হবে। এটা কখনো হয়নি।
বিওআইয়ের সেবা কখনো ওয়ানস্টপ হয়নি। অথচ বিনিয়োগ নিবন্ধনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব সেবা পাওয়ার কথা। চেয়ারম্যান তাঁর নির্বাহী নির্দেশের মাধ্যমে সবকিছু করতে পারেন। কিন্তু এ কাজগুলো না হওয়ার জন্য নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। এমনকি পুরোনো বিনিয়োগ দীর্ঘস্থায়ী হওয়া নিয়ে শঙ্কা থাকবে। আমরা যে সুযোগ বিনিয়োগকারীদের দিচ্ছি, অন্য দেশ সেটা দিচ্ছে না। তার পরও এখানে বিনিয়োগ হচ্ছে না। রোড শোর মাধ্যমে প্রচুর অর্থের অপচয় করা হচ্ছে। এভাবে কখনো বিনিয়োগ আসবে না। রোড শো না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু এমবিএর মাধ্যমে প্রজেক্ট প্রোফাইল করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করলে বেশি সুফল আসবে।

আকবর আলি খান
আকবর আলি খান

আকবর আলি খান: বাংলাদেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা শক্ত। কারণ, নির্ভর করা যায় এমন কোনো তথ্য নেই। ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে অনেক গোঁজামিল রয়েছে। ব্যাংকের তারল্য থেকেও বিনিয়োগের সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ, চলতি মূলধনসহ বিভিন্ন খাতে তারল্য প্রবাহিত হয়। বিদেশি বিনিয়োগের আগে দেশি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করা উচিত। বিনিয়োগ প্রকল্প খুব লোভনীয় হলে বিদেশিরা যেকোনো দেশে ঝাঁপিয়ে পড়বে। যেমন: টেলিফোন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি। দেশি বিনিয়োগ কম হলে সেখানে বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা খুবই কম।
দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অবস্থা কী, এটাও তারা জানতে চায়। এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক উত্তর না পেলে বিদেশিরা বিনিয়োগ করবে না। এ দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, যোগাযোগের সমস্যা রয়েছে। সুশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমস্যা রয়েছে। ব্যাংকেও সুশাসনের অভাব। এ জন্য সুদের হার বেশি। ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক সময় লেগে যায়। ঠিক সমেয় ঋণ না পাওয়াতে অনেকে ঋণ নিয়ে বিপদে পড়ে যান। ব্যাংকের আবার টাকা আনার ব্যাপারে যত আগ্রহ, বিনিয়োগের ব্যাপারে তেমন না। সরকারি ব্যাংকগুলোকে অবিলম্বে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে। সরকারের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা না হলে বিনিয়োগসহ সব ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে।

মোহাম্মদ নওশাদ আলী চৌধুরী
মোহাম্মদ নওশাদ আলী চৌধুরী

মোহাম্মদ নওশাদ আলী চৌধুরী: বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাই আজকে আলোচনার উদ্দেশ্য। আমাদের দেশের প্রবৃদ্ধি এখনো ৬ শতাংশ। আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খুবই সন্তোষজনক। মুদ্রাস্ফীতি কমে আসছে। এসবই দেশের ইতিবাচক বিষয়। ব্যাংকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অলস আছে। এটা খুব যে বেশি তা বলা যাবে না। দেশের ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে ভাগ করলে ব্যাংকপ্রতি তারল্যের পরিমাণ কমে আসবে। ব্যাংকের বিনিয়োগ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। সব সময় বড় বিনিয়োগ আসবে এমন না। ব্যাংককে বিনিয়োগের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে হবে। আমরা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তদারকি আগের থেকে অনেক বেড়েছে। ব্যাংকগুলো ডিজিটালাইজড হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং—সবই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
হতাশার কোনো কারণ নেই। সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে। গণমাধ্যমকে বিনিয়োগসহায়ক ভূমিকা রাখতে হবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশে, অনেকেই সেটা জানে না। আরও যেসব সুযোগ আছে, গণমাধ্যমে সেসব তুলে ধরতে হবে। বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখছে। অন্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: বিনিয়োগের জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জায়গা পাচ্ছে না। জায়গার অভাবে অনেকে ফিরে যাচ্ছে। এ জন্য সরকার যে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঘোষণা দিয়েছে, সেটা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। কেবল বক্তৃতা–আলোচনার মধ্যে বন্দী থাকলে হবে না, শিল্প কখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হয় না। শিল্পাঞ্চল হলে এক জায়গায় সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। শিল্পের জন্য জ্বালানি একটা বড় সমস্যা। গ্যাস ও বিদ্যুতের জ্বালানি খরচের পার্থক্যের জন্যও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই খরচের সমতা আনতে হবে। ব্যাংকের উচ্চ সুদের হারও বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতার একটি অন্যতম কারণ। যাঁরা উচ্চ সুদের সমালোচনা করেন, তাঁরা যখন ব্যাংক করেন, তখন বেশি সুদের পক্ষেই কথা বলেন। যাদের সুদের হার বেশি, তাদের করের হার বেশি। যাদের সুদের হার কম, তাদের করের হার কম করলে ব্যাংকের সুদের হার কমতে থাকবে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৬ সালের নির্বাচন পর্যন্ত আওয়ামী লীগবিরোধী দলগুলো সরকারে ছিল। এসব দলের লোকজন সরকারের সঙ্গে বৈধ-অবৈধ উপায়ে অর্থ বানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের লোকজন তাঁদের মতো অর্থ বানাতে পারেননি। সব সরকারের সঙ্গে এঁদের ভাব থাকে। বাংলাদেশে ১০০ জন বড় ব্যবসায়ীর মধ্যে বিশেষ একটা দলেরই আছেন ১৫ থেকে ২০ জন ব্যবসায়ী। এঁরা একেবারেই কোনো বিনিয়োগ করছেন না। সুশাসনের কথা বলে আর লাভ নেই। এমন কোনো সরকারি অফিস নেই, যেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ হয়। এ দুর্নীতির জন্য সাধারণ মানুষ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটাকে কঠোরহস্তে দমন করতে হবে।

কাজী সাইদুর রহমান
কাজী সাইদুর রহমান

কাজী সাইদুর রহমান: ব্যক্তি খাতে প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হয়নি। এটা যুক্ত হলে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ হবে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এটা খুবই ইতিবাচক। আমরা ক্লাসিফাইড ঋণকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছি। তা না হলে এখন ক্লাসিফাইড লোনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেত। সুদের হার নিয়ন্ত্রণের জন্যও কাজ করছি। এ জন্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। বর্তমানে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ। বৈদেশিক বিনিয়োগের ব্যাপারেও আমরা কাজ করছি। সামনের সময়গুলোতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা যায়।

সালেহউদ্দিন আহমেদ
সালেহউদ্দিন আহমেদ

সালেহউদ্দিন আহমেদ: প্রতিবার বাজেটসহ বিভিন্ন কারণে দেশে ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন হয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বাংলাদেশের ব্যাংকিং নীতি, আইন খুবই শক্ত। কিন্তু তদারকি সংস্থার চরম ব্যর্থতার জন্যই ব্যাংকে এত অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট হচ্ছে। ব্যাংকের অন্যতম কাজ হলো উদ্যোক্তা তৈরি করা। নতুনদের ঋণ দেওয়া। কিন্তু নতুন কেউ এলে তাকে অনেকগুলো কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাকে নাজেহাল করে ছাড়া হয়। এত দেরি করে ঋণ দেওয়া হয় যে এ ঋণ তার জন্য অনেক ক্ষেত্রে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। একজন বলল, ব্যাংকের অপারেটিং খরচ অনেক বেশি। কিন্তু ব্যাংকের মধ্যে ঢুকলে মনে হয়, হোটেলে থাকতে এসেছি। চা, কফি, এসি, টেলিভিশন—সবই আছে। অনেক ক্ষেত্রে বাহুল্য খরচ কমানো যায়। বিদেশি ঋণের অনেক ঝুঁকি আছে। আমার সময় কেউ সহজে বৈদেশিক ঋণ নিতে পারত না। বিনিয়োগের মাধ্যমে যদি কর্মসংস্থান হয়, তাহলে বিনিয়োগের সুফল সাধারণ মানুষ পাবে। আমার এক বন্ধুকে ভিয়েতনামের এক ব্যবসায়ী বলছেন, ‘তোমার দেশের চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত টাকা চায়। আমি ব্যবসা করতে না পেরে ফিরে এসেছি।’ আসলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে আমাদের কোনো উদ্যোগ কাজে লাগবে না।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: ব্যাংকার হিসাবে দেখি, কয়েকটি বিশেষ খাত যেমন: টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, কনস্ট্রাকশন, স্টিল শিল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে। ছোট শিল্পগুলো খুব ঝুঁকির মধ্যে আছে। অনেকে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে একটি শিল্প তৈরি হয়। এরপর কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু-তিন বছর লেগে যায় গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ পেতে। এভাবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের অপেক্ষায় থেকে শিল্পটি আবার ধংসের মুখে পড়ে যায়। এসব কারণে স্থানীয় বিনিয়োগ হচ্ছে না। স্থানীয় বিনিয়োগ না হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ হবে না। নতুন ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট কাজ না করে আর দশটা ব্যাংক যা করে, তা-ই করছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এসব বিষয় দেখতে হবে।
একসময় চট্টগ্রামে ইউনিলিভার, রেকিট, গ্লাসগো—এসব কোম্পানির প্রধান অফিস ছিল। এখন সবাই ঢাকায়। কারণ, ঢাকার মতো সুযোগ-সুবিধা অন্য জায়গায় নেই। বৈদেশিক ঋণের কাজ ছাড়া বিওআই আর কিছু করছে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশে একটা ব্যবসার প্রাথমিক নিবন্ধন পেতে সময় লাগে প্রায় ১১ দিন। কিন্তু এর পরিমিত মান ছয় ঘণ্টা। কাজের অনুমতি পেতে লাগে ২০১ দিন। বিদ্যুতের সংযোগ পেতে লাগে ৪০৪ দিন। সম্পদ রেজিস্ট্রেশনের জন্য লাগে ২৪৫ দিন। উন্নত দেশে এটা ২৬ দিন, ১৭ দিন ও এক দিন লাগে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত কাজ না হলে বিনিয়োগ হবে না।

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান: বিনিয়োগে স্থবিরতা আছে বলে মনে হয় না। আমাদের ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ভালো। তবে অলস অর্থও আছে। ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৫০টি স্পিনিং মিলে বিনিয়োগ করেছি। ১৯৮০ সালে গার্মেন্টস শুরু হওয়ার পর থেকে গার্মেন্টস ও এর লিংকেজে বিনিয়োগ করছি। ২০০০ সালে একসঙ্গে ১১টি স্পিনিং মিলে বিনিয়োগ করেছি। আমাদের একসময় মসলিন ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় টেক্সটাইল এসেছে।
১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ কোটি টাকা দেশে বিনিয়োগ হয়েছে। এর ৬০ ভাগ ঢাকায় ২০ ভাগ চট্টগ্রামে ও ২০ ভাগ অন্যান্য শহরে। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশ সব সময় অবহেলিত থেকে গেছে। একটি প্রশ্ন এসেছে—কাদের জন্য বিনিয়োগ? বিনিয়োগের অর্থে যদি কর্মসংস্থান হয়, জীবনমানের উন্নয়ন হয়, তাহলে অবশ্যই গ্রামে বিনিয়োগ করতে হবে। আমরা এ কাজ করছি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের গ্রামীণ এলাকায় বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছি। আমরা ১৭ হাজার গ্রামে নয় লাখ পরিবারের মধ্যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ করছি। বড় বিনিয়োগের জন্য যে অবকাঠামো দরকার, তা হঠাৎ হবে না। এর জন্য সময় প্রয়োজন। তাই বিদ্যমান অবস্থায় গ্রামীণ এলাকায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগের দিকে এগোতে হবে।

কামরান বাকর
কামরান বাকর

কামরান বাকর: দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনটি বহুজাতিক ও স্থানীয় ব্যাংক রয়েছে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা রয়েছে। এবং বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগও রয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ হচ্ছে না। কেন বিনিয়োগ হচ্ছে না, এ বিষয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন হলে সংসদীয় কমিটি হবে। সংসদে একটা সেশনে আলোচনা হতে পারে। অনেক বিষয় নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। কেন এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে না? বৈদেশিক বিনিয়োগ যদি সত্যিকার অর্থে আনতে হয়, তাহলে একে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। এবং সেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যে সমস্যা আছে, সেটা দূর করতে হবে। অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো দূর করতে হবে।

রাশেদ মাকসুদ
রাশেদ মাকসুদ

রাশেদ মাকসুদ: বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধনের ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) তিন-চার শতাংশের বেশি না। আসলে আমরা বিদেশি বিনিয়োগ চাই কি না, সেটি একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে যেসব বিদেশি বিনিয়োগ আছে, তারা কেমন আছে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। দেশের অনেক ক্ষেত্রে পুনর্গঠন করতে হবে। আলোচনায় এসেছে, দেশের চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত পয়সা চায়। এসব ক্ষেত্রে পুনর্গঠন করতে না পারলে দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগ হবে না। ঘুষ, দুর্নীতি বিনিয়োগের একটি বড় রকমের অন্তরায়। ঘুষ, দুর্নীতি বন্ধ না হলে ও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি না থাকলে দেশ সামনের দিকে এগোতে পারবে না।

রোকেয়া আফজাল রহমান
রোকেয়া আফজাল রহমান

রোকেয়া আফজাল রহমান: আমার নিজের ব্যবসার ক্ষেত্রে সবাইকে নিয়ে বসি। তাদের কাছ থেকে ব্যবসার সমস্যার দিকগুলো শুনি। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে ব্যবসাকে লাভজনক করার চেষ্টা করি। আজকের আলোচনায়ও অনেক সমস্যার বিষয় এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বাধা দূর হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমাদের সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তারা বাংলাদেশকে সবুজ ক্ষেত্র বলে অভিহিত করে। দেশে বিদ্যুৎ, বন্দর ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ আছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ দিতে হবে। কয়েক বছর আগে দ্য ডেইলি স্টার থেকে মোমেন সাহেব বিজনেস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। তিনি মন্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘আমাদের গ্যাস-বিদ্যুৎ দিলে বাংলাদেশকে বদলে দেব।’ সত্যি তাই। গ্যাস-বিদ্যুৎ থাকলে বাংলাদেশের উন্নয়ন কেউ ঠেকাতে পারবে না।

সৈয়দ আবদুস সামাদ
সৈয়দ আবদুস সামাদ

সৈয়দ আবদুস সামাদ: বিনিয়োগের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিওআই সমন্বয় করে থাকে। ট্যাক্স, রেমিট্যান্স, রিজার্ভ ইত্যাদি লক্ষ্যমাত্রা আছে। কিন্তু বৈদেশিক বিনিয়োগের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। তবে বিনিয়োগকারীদের বহুমাত্রিক সুযোগ রয়েছে। বিওআইসহ সাত-আটটি সংস্থা বিনিয়োগের বিষয়টি দেখে। সবার ওপর বিওআইয়ের নিয়ন্ত্রণ নেই। ধরা যাক, বন্দর করার মতো একটা ভালো প্রস্তাব এল। মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া আমরা কিছু করতে পারি না। কেন আমাদের বৈদেশিক বিনিয়োগে অগ্রাধিকার নেই? বৈদেশিক মূলধন পরিচালনার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। বৈদেশিক ঋণ, বণ্টনকৃত বাজেটগুলো নিয়ে কাজ করেছি। বিনিয়োগের জন্য শত শত মানুষ আসে। কিন্তু এরা দ্রুত সবকিছু চায়। দ্রুত দিতে পারি না। অগ্রসর অনেক দেশের গতি, জিডিপি, মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে বেশি। এফডিআই কীভাবে এক হবে? ভারত, চীন এসব দেশও সহজে বৈদেশিক বিনিয়োগ গ্রহণ করেনি। 

গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামোগত সমস্যা, প্রশাসনিক জটিলতা; এ ছাড়াও বন্যা, সিডর, আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিবছর আমাদের থাকেই। বিনিয়োগকারীরা সব সময় ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ আশা করে। আমাদের এখানে অনেক সংস্কার হচ্ছে। আগে নিবন্ধন করতে তিন-চার মাস সময় লাগত। এখন সেটা চার ঘণ্টায় হয়। এখানে যা আলোচনা হয়েছে, এর প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বিষয়ের প্রান্তিক একটি ফলাফল রয়েছে। ২০০৭ সালে ৬৬৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রতিবছর এটা বাড়ছে। ট্রেডিং খুব সহজ। বাংলাদেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা দুটোই রয়েছে। একজন বিনিয়োগকারী এসব দেখেই বিনিয়োগ করবেন।

আব্দুল কাইয়ুম: বাংলাদেশে বিনিয়োগের বাধা ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। কর, ভ্যাট, ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন, ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বিভিন্ন খাতের দক্ষতাসহ নানা বিষয় আলোচনায় এসেছে। কর্তৃপক্ষ এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে আশা করি। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।

যাঁরা অংশ নিলেন

সৈয়দ আবদুস সামাদ : নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট (বিওআই)
রোকেয়া আফজাল রহমান : সভাপতি, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স
আকবর আলি খান : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
মোহাম্মদ নওশাদ আলী চৌধুরী: নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক
সালেহউদ্দিন আহমেদ : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
এ কে আজাদ : সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : সম্মানীয় ফেলো, সিপিডি
আফতাব উল ইসলাম : সভাপতি, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ
আলী রেজা ইফতেখার : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ইবিএল
রাশেদ মাকসুদ : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিটি কান্ট্রি অফিসার, সিটিব্যাংক এনএ
কামরান বাকর : চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিলিভার, বাংলাদেশ
কাজী সাইদুর রহমান : মহাব্যবস্থাপক, ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্র্যাক ব্যাংক
সূচনা বক্তব্য
মতিউর রহমান : সম্পাদক, প্রথম আলো
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো