default-image

সিউ এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার সন্ধ্যার আগে মা বনমোরগটি চারটি ছানা নিয়ে ভাড়াউড়া চা-বাগানের নির্জন স্থানে ঘুরতে বেরিয়েছিল। হঠাৎ করেই তাদের এই আনন্দকে তছনছ করে বিপদ নেমে আসে। জিসু কাহার নামের এক কিশোর বনমোরগ ও ছানাদের ধাওয়া করে। মা ছানাগুলোকে নিয়ে বুনো ঝোপের দিকে দৌড় দিলেও তিনটি ছানা ধরা পড়ে যায়। একটি যেতে পেরেছে মায়ের সঙ্গে। ধরা পড়া ছানাগুলোকে বাড়ি নিয়ে আসে ওই কিশোর। বনমোরগের ছানা ধরার খবরটি ওই দিনই রাতে জানতে পারেন সিউয়ের সদস্য কাজল হাজরা। ওই রাতেই বন্যপ্রাণীর আলোকচিত্রী খোকন থৌনাউজম, কাজল হাজরাসহ ওই ছেলের বাড়িতে ছুটে যান। ছেলে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বোঝানো হয় এভাবে বনমোরগের বাচ্চানো বাঁচানো সম্ভব নয়। ওদের মা ছাড়া বাঁচানো যাবে না। এদের মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।

সেই কথা অনুযায়ী, পরদিন সোমবার সকালে তাঁরা আবার ওই কিশোরের বাড়িতে যান। ছানাগুলোকে যেখান থেকে ধরা হয় এবং মা বনমোরগ যে ঝোপের দিকে গিয়েছিল সেখানে ছেড়ে দিয়ে তাঁরা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেন, কখন বনমোরগ এসে তার সন্তানদের নিয়ে যায়। ছানাগুলো দেড়-দুই ঘণ্টা ওখানে ঘোরাঘুরি করার পরও মায়ের কোনো সাড়া মিলেনি। হয়তো সন্তানহারা মা ভয়ে ওই এলাকাই ছেড়ে গেছে। এই অবস্থায় এত ছোট ছানাদের মা ছাড়া উন্মুক্ত বনে ছেড়ে দিলে বেজি, সাপ, চিল খেয়ে ফেলতে পারে।

পরে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগসহ সিদ্ধান্ত হয় ছানাগুলো কিশোরটির কাছেই থাকবে। এখানেই লালন–পালন করে বনে ছাড়ার উপযোগী করা হবে। ছেলেটিকে লালন-পালন করার পদ্ধতিও বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বন বিভাগ তাকে সহযোগিতা করবে। কিন্তু ছেলেটি ও তার পরিবার পোষা মোরগ ছানার মতো এগুলোকে উঠানে ছেড়ে দিতে থাকে। এতে যেকোনো সময় মা ছাড়া ছানাগুলোকে চিল, বেজি, কুকুর-বিড়াল খেয়ে ফেলতে পারে। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে গত মঙ্গলবার খোকন থৌনাউজমের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসা হয়েছে ছানাগুলোকে। ছানাগুলো খাওয়াদাওয়া করছে, নিরাপদ ও ভালো আছে।

বন্য প্রাণী উদ্ধারকারী ও বন্য প্রাণীর আলোকচিত্রী খোকন থৌনাউজম আজ বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাচ্চাগুলো একদম ছোট। দেড়-দুই দিনের হবে। এগুলোকে বনে ছেড়ে দিলে কোনোভাবে টিকতে পারত না। সাপ-ব্যাঙ খেয়ে ফেলবে। মা ছাড়া বাঁচানো যাবে কি না, জানি না। তবে চেষ্টা করছি। অনেকেই বনমোরগ ধরে পালার চেষ্টা করেন, বাঁচে না। বাচ্চার একটি একটু দুর্বল, দুটা ভালো আছে। বাচ্চাদের ঘাস কুচি কুচি করে কেটে, ঘাসের বীজ ও ধানের কুড়া খাওয়ানো হচ্ছে। তারাও খাচ্ছে। আট-দশ দিন রেখে একটু বড় হলে লাউয়াছড়ায় তাদের ছেড়ে দেব।’

বন্যপ্রাণী গবেষকদের সূত্রে জানা গেছে, বনমোরগ বনমুরগি বা জংলি মুরগি নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Red Jungle Fowl। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Gallus gallus murghi। বনমোরগ আবাসিক পাখি। চট্টগ্রাম, সিলেট ও ঢাকা বিভাগের সব বন এবং সুন্দরবনে বাস করে। ভারত, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে দেখা যায়। এককালে দেশের প্রায় সব বনজঙ্গলেই দেখা যেত। ব্যাপক শিকারের কারণে পাহাড়ি বনে এরা এখন হুমকির মুখে। খুব ভোরে ও সন্ধ্যার আগে মাটি থেকে কুড়িয়ে বিভিন্ন শস্যদানা, ঘাসের গোড়া, কীটপতঙ্গ, ফল ইত্যাদি খেয়ে থাকে। রাত কাটায় উঁচু গাছের ডালে বা বাঁশঝাড়ে। ভালো উড়তে পারে। কক্ কক্ শব্দ করে ডাকে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম আজ প্রথম আলোকে বলেন, খোকন থৌনাউজমের কাছে বনমোরগের ছানাগুলো আছে। খোঁজ নিয়েছিলাম। বলেছেন খাবার খাচ্ছে। বাঁচবে কি না আল্লাহই জানে। একেবারে ছোট বাচ্চা। বন্যপ্রাণী না ধরার জন্য বিভিন্ন সময় প্রচারণা চালানো হয়। কিন্তু কেউ কেউ এর গুরুত্ব বুঝে না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন