নতুন প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করছেন কৃষকেরা। সম্প্রতি কলাপাড়ার কুমিরমারা গ্রামে
নতুন প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করছেন কৃষকেরা। সম্প্রতি কলাপাড়ার কুমিরমারা গ্রামেছবি: প্রথম আলো

বঙ্গোপসাগরের তীরের একটি ইউনিয়ন নীলগঞ্জ, চারদিকে ছোট-বড় নদী। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার এই ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম এখন দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম কৃষিক্ষেত্র। বিষমুক্ত সবজি হিসেবে এখানকার শাকসবজি জেলা ছাড়িয়ে অন্য জেলা ও রাজধানীতেও যাচ্ছে। অথচ স্বাধীনতার আগেও এখানে চাষবাস হতো খুব কম। লবণপানির কারণে বছরে একটিই ফসল আমন হতো তখন। বছরের বাকি সময় লোকজন হয় মাছ ধরে, নয় দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

পরিস্থিতির বদল হয় একজন কৃষকের হাত ধরে। শফিউদ্দিন (৮০) নামের ওই ব্যক্তি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই নীলগঞ্জে শুরু করেন বারোমাসি সবজির চাষ। তাঁর সবজি চাষের সাফল্যে পুরো ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম সবুজে ভরে উঠেছে। নীলগঞ্জের এক ফসলি জমি হয়ে উঠেছে সারা বছরের চাষ উপযোগী।

নীলগঞ্জে সবজি চাষ হচ্ছে ক্ষতিকারক কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার ছাড়াই। এই সবজি জেলা ও জেলার বাইরে খ্যাত হচ্ছে ‘পাখিমারার সবজি’ নামে। এর মূলে রয়েছে ইউনিয়নের পাখিমারা বাজারটি। এই বাজারের ইউনিয়নের সবজিচাষিরা তাঁদের উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে থাকেন। পরে এখান থেকেই সেসব বিষমুক্ত সবজি ছড়িয়ে পড়ে উপজেলা সদর থেকে জেলা, বিভাগ, এমনকি রাজধানীতেও।

বিজ্ঞাপন

শুরুটা যেভাবে

নীলগঞ্জের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে একটি বৃহৎ খাল। মূলত দেশের অন্যতম বৃহৎ উপকূলীয় নদী আন্ধারমানিকের শাখানদী এটি। পাখিমারা এলাকায় এটি পাখিমারা খাল এবং কুমিরমারা এলাকায় এটি কুমিরমারা খাল নামে পরিচিত। এই খালের লবণাক্ততার কারণেই নীলগঞ্জে একসময় শুধু একটিই ফসল হতো। লবণপানির কারণে আমন আবাদেও কৃষকদের তখন হিমশিম খেতে হতো।

২০০৫ সালে স্থানীয় কৃষকেরা খালে প্রয়োজনীয় মিঠাপানি ধরে রাখার জন্য জোট বাঁধেন। প্রভাবশালীদের হাত থেকে খাল দখলমুক্ত করে স্বেচ্ছাশ্রমে খালে আরও ৪টি অস্থায়ী বাঁধ দেন। এই অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে মিঠাপানি সংরক্ষণের ফলে ইউনিয়নের ৭ গ্রামের কৃষক আমনের পাশাপাশি সবজি চাষেও ব্যাপক সাফল্য পেতে শুরু করেন। সাফল্যের শুরু হয় সেখান থেকেই।

কৃষক শফিউদ্দিন বলেন, বর্গাচাষি ছিলেন তিনি। সবজি চাষ করে তিনি ২ একর ৬৬ শতাংশ জমির মালিক হয়েছেন। তাঁর সেই জমি ৭ ছেলের মধ্যে বণ্টন করেছেন তিনি। সন্তানেরাও এখন সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী।

কৃষিতে আধুনিকতা

নীলগঞ্জে সবজি চাষের শুরুটা সনাতন পদ্ধতিতে হলেও এখন নতুন প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করছেন কৃষকেরা। সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক কৃষক গ্রিনহাউস পদ্ধতির আদলে নিজস্ব পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছেন। প্লাস্টিকের স্বচ্ছ আবরণ দিয়ে ঢেকে সেখানে বোম্বাই মরিচ, টমেটো, কাঁচা মরিচ, গাজর, লালশাক, বাটিশাক, পালংশাক, ধনের আবাদ করতে দেখা গেছে।

কৃষকেরা জানান, গ্রিনহাউস পদ্ধতির আদলে আবাদ করে সনাতন পদ্ধতির চেয়ে তিন গুণ বেশি ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে।

কুমিরমারা গ্রামের মো. জাকির (৩২) নীলগঞ্জে এই পদ্ধতিতে চাষাবাদের প্রথম উদ্যোক্তা। আগে ঢাকায় নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। কৃষিকাজে শুরুতে আগ্রহ ছিল না জাকিরের। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর চারদিকে চাষিদের সবজি চাষে সাফল্য দেখে নিয়েও সবজি চাষে জড়িয়ে পরেন।

জাকির বলেন, ইউটিউবে দেখে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে গ্রিনহাউসের আদলে বাঁশ-স্টিলের কাঠামো তৈরি করে তার ওপর প্লাস্টিকের স্বচ্ছ আবরণ দিয়ে সবজি চাষ শুরু করেন। বোম্বাই মরিচ, তিন ধরনের ফুলকপি, টমেটো ছাড়াও এখন বিদেশি গাজর, লেটুসসহ আরও অনেক সবজি চাষ শুরু করেছেন।

বিজ্ঞাপন

গড়ে উঠেছে কৃষি বিপণনকেন্দ্র

নীলগঞ্জে উৎপাদিত শাকসবজির বাজারজাতকরণে কৃষকদের এখনো ভোগান্তি রয়েছে গেছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে গ্রামের কর্দমাক্ত সড়ক পেরিয়ে নয়তো পাখিমারা খালে নৌকায় পণ্য পারাপারে দুর্ভোগের কারণে পণ্য বাজারজাত করতে কৃষকদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে কৃষকেরা নিজেদের উদ্যোগে পাখিমারা বাজারে একটি কৃষি বিপণনকেন্দ্র খোলেন। এর নাম দেওয়া হয় ‘কালেকশন পয়েন্ট’। স্থানীয় কৃষকেরা নজরুল কাজী নামে এক ব্যক্তিকে এখানে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োগ দেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুল মান্নান বলেন, নীলগঞ্জের ১৫টি গ্রামে দেশি সবজি ছাড়াও রেড বিট, ব্রকলিসহ লবণসহনশীল আলুর জাত ‘মেট্রো’ আবাদ হচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন সবজি হচ্ছে, যার অর্থনৈতিক মূল্য ১৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন