তারা বানু প্রথম আলোকে বলেন, ‘বান প্রতিবার সব উল্টাপাল্টা কইরা যাই। ভাঙা ঘরে এহনও (এখন) বান ঢোকেনি। ঘরের পিড়েতে বান বাড়ি খাচ্ছে। আজকের মধ্যেই ঘরে আর থাহুন যাইবে না। কোনঠাও যাওয়ান যাই না। বিয়ান বেলা এক মুঠ হুদা ভাত খাইছি। হুদা ভাত গলা দিয়ে নামে না গো। সাত দিন হইল বানে পইড়ে আছি। কেউ কোনডাই দিল না। গরিবগরে কষ্ট কেউ বুঝে না গো।’

তারা বানুর মতো ইসলামপুর উপজেলার বামনা, পশ্চিম বামনা, পূর্ব বামনা, আমতলি, চিনাডুলী গ্রামের অনেকেই বন্যার কারণে বিপাকে পড়েছেন। এসব গ্রাম যমুনা নদীবেষ্টিত। বর্ষা মৌসুমে বন্যার পানিতে প্রথম ভাসে। অন্যদিকে নদীভাঙনের শিকারের কারণে বেশির ভাগ মানুষ হতদরিদ্র। ফলে এসব জনপদের মানুষ দিন আনে দিন খায়। বন্যার কারণে টানা সাত দিন ধরে তাঁরা ঘরবন্দী থাকায় কষ্ট বেড়ে গেছে।
দুপুর ১২টার দিকে সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে জবেদা বেগম কোমরপানি ভেঙে কোথায় যেন যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে বন্যা নিয়ে কথা হয়।

তিনি বলেন, ‘কয়েকবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছি। স্বামীও আরেকটি বিয়ে করে চলে গেছেন। মেয়েকে নিয়ে খুব কষ্টে জীবন যাপন করছি। কয়েকটি ছাগল, হাঁস-মুরগি লালন–পালন করে কোনো রকমে দিন পার করি। তার মধ্যে সাত দিন ঘর থেকে বের হওয়া যাই না। চারপাশে ঢালা পানি যাচ্ছে। ঘরের মধ্যে ছাগল রাখছি। নিজেরাই খাবার পাই না। পশুরে কীভাবে খাওয়াব। তাই গাছের পাতা আনতে পানিতে নামছি। কোনো সাহায্য পাওয়া তো দূরে থাক, সাত দিন পার হচ্ছে, কেউ খোঁজও নিতে আসেনি।’

পূর্ব বামনা গ্রামের আবদুল বাছেদ অভিযোগ করে বলেন, ‘বান আসা মানেই এলাকার মেম্বার-চেয়ারম্যানদের জন্যে রোজগারের পথ খোলে। আপনারা আমাদের কষ্টের কথা সরকারকে জানান। আমগোরে জন্যে কত কিছু দেই সরকার। আপনারা বাড়ি বাড়ি যান। কেউ কিছুই পায়নি। তাহলে এগুলো যায় কোথাই। তাঁরাই (জনপ্রতিনিধি) খাইয়া ফেলে।’

চিনাডুলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুরো ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। প্রায় ২০ হাজার মানুষ বর্তমানে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। এ দুর্ভোগ চলছে পাঁচ দিন ধরে। মানুষের নেই তেমন কোনো কাজকর্ম। এসব এলাকার মানুষ দিন আনে দিন খাই। পাঁচ দিন ধরে ঘরে বসা তাঁরা। সবার মধ্যে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এত মানুষের মধ্যে মাত্র তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই চাল ৪০০ জন বন্যার্তদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী না থাকলে দিব কীভাবে। ফলে বানবাসিরা নানা রকম অভিযোগ করছেন।’

জামালপুরে গত কয়েক দিনে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে গত বৃহস্পতিবার থেকে বন্যা দেখা দিয়েছে। প্লাবিত হয়েছে রাস্তাঘাট, হাটবাজার, ফসলি জমি, মৎস্য খামার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার ৫টি উপজেলার ৩২টি ইউনিয়নের ৯৩টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ হাজার ১৬৭টি পরিবার। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ত্রাণসহায়তা হিসেবে ৩৫০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৭ লাখ টাকা ও ৪ হাজার শুকনা প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত ইসলামপুরের বন্যাদুর্গত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মানুষের বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটে পানি উঠেছে। বিভিন্ন গ্রামের অভ্যন্তরীণ পাকা ও মাটির রাস্তার ওপর দিয়ে স্রোত বয়ে যাচ্ছে। বন্যার্ত মানুষ নৌকা নিয়ে চলাচল করছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পানি সর্বত্র ছড়িয়ে যাচ্ছে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানি পরিমাপক আবদুল মান্নান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ১১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসাইন জানান, বন্যার্তদের জন্য এরই মধ্যে সারা জেলায় ৩৫০ মেট্রিক টন চাল, ৭ লাখ টাকা ও ৪ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন