default-image

বিপরীত লিঙ্গের দুজন মানুষের মধ্যে সামাজিক ও আইনি সেতুবন্ধ রচনার নাম বিয়ে। এটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানও। সম্পূর্ণ বিশ্বাস আর বোঝাপড়ার মাধ্যমে দুটি প্রাণ যেন এক হয়ে যায় বিয়ে নামক এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হতেই স্থবিরতা নেমে এসেছে বিয়েসহ সব ধরনের অনুষ্ঠানে।

গাজীপুরের কাজিরা বলছেন, বিয়েখরার শুরু মার্চ থেকে। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগে জেলায় একেক কাজি মাসে ২০ থেকে ২৫টি বিয়ে পড়াতেন। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে সাত থেকে আটটিতে। তার ওপর লকডাউনের দুই মাসে কোনো বিয়েই হয়নি। এখন দু-একটি বিয়ে হলেও তা জরুরি ভিত্তিতে, অনেকটা ঠেকায় পড়ে।

বিয়ে সামাজিক বন্ধন বা অনুষ্ঠান হলেও কারও কারও কাছে আয়ের বড় উৎস। জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে কাজিদের আয় পুরোপুরি নির্ভর করে বিয়ে পড়ানোর ওপর। তা ছাড়া বিয়েসামগ্রীর দোকান, ডেকোরেটর, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টসহ অন্য অনেক ব্যবসা ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিয়ের সঙ্গে। ফলে করোনায় বিয়ে কমে যাওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন এসব ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অফিসভাড়া বাকি, সঞ্চয়ে হাত কাজিদের
গাজীপুর নগরের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাজির দায়িত্বে মো. মাসহুদুল বাসেত। ২০০৯ সাল থেকে বিয়ে পড়ান তিনি। তাঁর অফিস ওয়ার্ডের আরিচপুর সড়কের গফুরের মসজিদ এলাকায়। করোনার আগে মাসে বিয়ে পড়াতেন ২০ থেকে ২২টি। যে ফি পেতেন তা দিয়ে চলত অফিসসহ সংসারের খরচ। কিন্তু করোনায় বিয়ে কমে যাওয়ায় তাঁর আয় নেই বললেই চলে। এর মধ্যে অফিসভাড়া বাকি পড়েছে তিন মাসের। সহকারীর খরচও দিতে হচ্ছে নিজের পকেট থেকে।

মাসহুদুল বাসেত বলেন, ভাড়া, সহকারীর বেতনসহ অন্য খরচ নিয়ে মাসে অফিস বাবদ খরচ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। বিয়ে পড়ানোর টাকাতেই এসব খরচ বহন করতে হয়। কিন্তু করোনার কারণে এখন সেই খরচ দিতে হচ্ছে নিজের পকেট থেকে। তাঁরা কোনো সরকারি বেতন বা ভাতাও পান না।

একই অবস্থা নগরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি মো. মহিউদ্দিনের। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাশেই তাঁর কার্যালয়। তিনিও প্রায় ২০ বছর এ পেশায়। বিয়ে কমে যাওয়ায় তাঁরও অফিসভাড়া বাকি পড়েছে দুই মাসের। সঙ্গে রয়েছে অফিস সহকারীর বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ। মহিউদ্দিন বলছিলেন, ‘কাজ না থাকায় এত দিন নিজের জমানো টাকা ভেঙেছি। এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কাজ খুব একটা না থাকলেও অফিস খুলে বসে থাকতে হয়।’

default-image

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাজীপুর জেলায় কাজির সংখ্যা ১০৩। এর মধ্যে অনেকেরই মূল পেশা এটি। জেলা কাজি সমিতির সভাপতি মো. শরিফ হোসেন বলেন, ‘প্রায় প্রত্যেকেই মাঝেমধ্যে অফিসভাড়া বা সংসার চালানের সমস্যার কথা আমাদের বলেন। আমরা এ ব্যাপারে আর্থিক প্রণোদনা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছি। আশা করছি সহযোগিতা পাব।’

বিক্রি নেই, দোকানিদের মাথায় হাত
বিয়ে কমে যাওয়ায় ধস নেমেছে বিয়েসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়। বিশেষ করে প্রসাধনী, পাগড়ি, শেরওয়ানি, ঝুড়ি, ডালা, কুলা, গয়না, ফুলসহ অন্য পণ্যের দোকানগুলোয় কেনাকাটা নেই বললেই চলে। আগে যেখানে একেকটি দোকানে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি বিয়ের পণ্য বিক্রি হতো, এখন সেখানে বিক্রি হয় সপ্তাহে এক বা দুটির। তা–ও খুবই সীমিত পরিসরে।

সুমি কসমেটিকস শপ টঙ্গী বাজারের পুরোনো বিয়ের দোকান। বিভিন্ন প্রসাধনীপণ্যের পাশাপাশি রাখা হয় বিয়ের সব প্রয়োজনীয় সামগ্রী। আগে প্রতিদিনই দোকানে ক্রেতাদের ভিড় থাকত। কিন্তু করোনার পর থেকে বেচাকেনা নেই বললেই চলে। দোকানি আলামিন হোসেন বলেন, আগে বিয়ের পাগড়ি বা শেরওয়ানি ভাড়া নেওয়ার জন্য সিরিয়াল পড়ে যেত। অনেক সময় চাহিদামতো দেওয়া যেত না। এখন সেগুলোতে ধুলা জমে গেছে। তিনি বলেন, এখন দু-একটি বিয়ে হলেও তা হয় ঘরোয়া পরিসরে। তাই কেনাকাটার প্রয়োজন হয় না।

নগরের জয়দেবপুর বাজারের পরিচিত শাড়ির দোকান রেশম কুটির রাজশাহী সিল্ক। এখানে বেনারসি বা হলুদের শাড়ি থেকে শুরু করে বিয়ের প্রায় সব কাপড়চোপড় পাওয়া যায়। দোকানটির স্বত্বাধিকারী মো. আজিজুল আলম বলেন, ‘বেচাকেনা এতটাই খারাপ যে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দিতে পারছি না। বাধ্য হয়ে হয়ে স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। অবস্থার উন্নতি না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’

ডেকোরেটর, কমিউনিটি সেন্টার ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায় ধস
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবসা শুরু করেছিলেন বোর্ডবাজার এলাকার মো. আতিকুল ইসলাম। বাড়ির পাশে সাজানো–গোছানো একটি অফিসও ভাড়া নিয়েছিলেন। ফেসবুক বা অন্য মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে বেশ পরিচিতি পেয়েছিলেন। করোনার আগে কাজও পেয়েছিলেন তিনটি বিয়ের। কিন্তু করোনা শুরু হতেই থমকে যায় তাঁর সবকিছু।

আতিকুল বলেন, পড়ালেখা করা অবস্থাতেই স্বপ্ন ছিল নিজে কোনো একটা ব্যবসা করবেন। এগোচ্ছিলেনও সেভাবে। কিন্তু মাঝখান দিয়ে করোনা সব এলোমেলো করে দিল। তিনি বলেন, ‘ক্যারিয়ারের শুরুতেই এমন ধাক্কা খাব তা ভাবতে পারিনি। নিজের জমানো টাকা, ধারদেনা সব পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়।’

default-image

একই দুর্দশার কথা জানালেন নগরের একাধিক কমিউনিটি সেন্টার ও ডেকোরেটরের ব্যবসায়ীরা। তাঁরাও বিয়ে কমে যাওয়ায় পড়েছেন চরম বেকায়দায়। ইতিমধ্যে ছোট পরিসরের ব্যবসায়ীরা টিকতে না পেরে ব্যবসা ছেড়ে চলে গেছেন গ্রামে। আবার কেউবা আশায় আছেন ভবিষ্যতের কোনো সুদিনের।

টঙ্গীর দত্তপাড়া এলাকার মো. আলমগীর হোসেন প্রায় ৩০ বছর ধরে ডেকোরেটর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, জন্মদিন, সুন্নতে খতনা বা অন্য অনুষ্ঠানের ডাক পেলেও তাঁরা সব সময় বিয়ের অপেক্ষায় থাকেন। হলুদ থেকে শুরু করে বউভাত পর্যন্ত সব আয়োজনের সুযোগ থাকে। সে ক্ষেত্রে ব্যবসা হয় ভালো। কিন্তু করোনায় বিয়ে আটকে যাওয়ায় সবকিছুতে ভাটা পড়েছে। তা ছাড়া জনসমাগম নিষিদ্ধ থাকায় অন্য কোনো অনুষ্ঠানেও ডাক পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলে টিকে থাকাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কাজ না থাকায় তিন মাসের দোকানভাড়া দিতে পারছেন না। সংসারের খরচ ওঠাতে করতে হচ্ছে অন্য কাজ।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন