নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ ধরতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। পরিবারের সদস্যরা জাল মেরামত করছেন। সোমবার বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের নাইয়া বাড়ি এলাকায়
নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ ধরতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। পরিবারের সদস্যরা জাল মেরামত করছেন। সোমবার বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের নাইয়া বাড়ি এলাকায়সাইয়ান

দেশের নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আগামীকাল বুধবার মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে ইলিশের বংশবিস্তার নির্বিঘ্ন করতে গত ১৪ অক্টোবর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। তবে ২২ দিনের মা ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ১ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে আট মাসের জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা। তা চলবে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত।

এদিকে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই উপকূলের জেলেরা নদী ও সাগরে ইলিশ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে জেলেরা জাল, ট্রলার মেরামতসহ সব রকমের কাজ শেষ করেছেন। ট্রলারগুলোতে বাজারসওদা করে ফেলেছেন। এখন ট্রলারের খন্দলে বরফ নেওয়ার পালা। আগামীকাল রাত ১২টার পরই জেলেরা পুরোদমে নদী ও সাগরের উদ্দেশে নৌকা ভাসাবেন।

বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন মৎস্যবন্দরে জেলেরা অপেক্ষায় আছেন নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হওয়ার। বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের নাইয়াবাড়ি গ্রামটি জেলে–অধ্যুষিত। গতকাল সোমবার ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জেলেরা বাড়ির উঠান ও রাস্তার পাশের খোলা স্থানে জাল মেরামত করছেন, কেউ জাল গোছগাছ করছেন। আবার কেউ নৌকায় মেরামত শেষে নদীতে নামাচ্ছেন।

গ্রামের হানিফ সিকদার (৫২) নামের এক জেলে বলেন, ‘২২ দিন খুব কষ্টে কাটছে। মোরা তো মাছ ধরন ছাড়া কোনো কামকাইজ পারি না। গাঙ্গে মাছ ধইরাই সোংসার চলে। নিষেধাজ্ঞা শ্যাষ অইলেই য্যাতে গাঙ্গে নামতে পারি, হেইতে সবকিছু হুছাইয়্যা রাখতে আছি।’

বিজ্ঞাপন
default-image

দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম মৎস্যবন্দর বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ট্রলারমালিক আবদুল হক আজ মঙ্গলবার জানান, এবার মৌসুমে সাগরে জেলেদের জালে তেমন মাছ পাওয়া যায়নি। মালিকদের পুঁজি ওঠেনি। তাই নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই সাগরে ট্রলার পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। জেলেরা ইতিমধ্যে ঘাটে এসে ট্রলারে অপেক্ষা করছে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি গাজী ফজলুল হক বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর যাতে জেলেরা ট্রলার নিয়ে দ্রুত সাগরে যেতে পারেন, সে জন্য অসংখ্য ট্রলার মহিপুরে অবস্থান করছে। ট্রলারগুলোয় বাজারসওদা করে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে।

২২ দিন অলস সময় কাটানোর পর সাগর ও নদীতে মাছ ধরতে নামবেন জেলেরা। এ কারণে স্বস্তি ফিরে আসছে জেলে পরিবারগুলোয়। গতবারের চেয়ে এবার মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করছেন জেলা মৎস্য বিভাগ ও মৎস্যজীবীরা।
বরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি আশরাফ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইলিশের মৌসুম মূলত অক্টোবরেই শেষ। তারপরও নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর প্রতিবছরই সপ্তাহখানেক প্রচুর ইলিশ জালে ধরা পড়ে। আশা করি এবারও সে রকমই হবে।’

প্রজনন মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ১ নভেম্বর থেকে দেশের সব নদ-নদীতে আট মাস জাটকা (২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের ইলিশ) ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আট মাস জাটকা ধরা, বিক্রয়, মজুত ও পরিবহন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। তবে বড় আকারের ইলিশ ও অন্যান্য মাছ ধরতে কোনো বাধা নেই।

ইলিশের মৌসুম মূলত অক্টোবরেই শেষ। তারপরও নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর প্রতিবছরই সপ্তাহখানেক প্রচুর ইলিশ জালে ধরা পড়ে। আশা করি এবারও সে রকমই হবে।
আশরাফ আলী, সভাপতি, বরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য আড়তদার সমিতি

এদিকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরায় ৪ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ২১ দিনে ৯৮০ জন জেলের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান হয়েছে ৯০৮টি আর অভিযান চালানো হয়েছে দুই হাজারের বেশি। আর মামলা করা হয়েছে ১ হাজার ৮৪টি। এ সময়ে জরিমানা আদায় হয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং মা ইলিশ উদ্ধার হয়েছে ৮ দশমিক ৮৮ মেট্রিক টন। বিভিন্ন নদ-নদীতে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয়েছে ৭১ লাখ ৪৫ হাজার মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘এবার নিষেধাজ্ঞা আগের তুলনায় অনেক বেশি সফল হয়েছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে সব ধরনের সহযোগিতার কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। সাধারণ জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন। আশা করি, ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0