default-image

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ২৫টি দুর্যোগ–সহনীয় বাসগৃহ। কিন্তু এসব গৃহের বেশির ভাগই দরিদ্র ও গৃহহীন ব্যক্তিরা পাননি। দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ গৃহ পেয়েছেন সাংসদের ভাতিজা, ভাগনে, নাতি, প্রতিবেশী ও দলীয় লোকজন। পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সাংসদ মো. মহিব্বুর রহমান নিজ আত্মীয়স্বজনের স্বার্থ রক্ষায় গৃহ বরাদ্দে অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংসদ মহিব্বুর রহমানের বাড়ি উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলায় বরাদ্দ ২৫টি দুর্যোগ–সহনীয় বাসগৃহের মধ্যে ২১টিই পেয়েছেন এ ইউনিয়নের লোকজন। এঁদের সিংহভাগই যে দরিদ্র সেজে তালিকায় নাম তোলা সাংসদের আত্মীয়স্বজন ও দলীয় লোকজন। শুধু তা–ই নয়, প্রকল্পের নকশা বদলে নিজ পছন্দে গৃহ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পের তথাকথিত উপকারভোগী সাংসদের এই আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় উপজেলার গৃহহীন ব্যক্তিদের জন্য দুর্যোগ–সহনীয় প্রতিটি বাসগৃহের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। এতে ২৫টি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২৫ জনের তালিকায় ধুলাসার ইউনিয়নের বাসিন্দা ২১ জনকে বাদ দিলে বাকি ৫ জনের মধ্যে দুজন ডালবুগঞ্জ, একজন লতাচাপলী এবং একজন ধানখালীর।

বিজ্ঞাপন

তালিকায় ১ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে মো. আনিচ দালালের নাম। তিনি ধুলাসার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ইউনুস দালালের ভাই। ৩ নম্বর ক্রমিকের নুহু মৃধা, তিনি সাংসদের ভাতিজা। ৫ নম্বর ক্রমিকের হোন্নান হাওলাদার ও ২০ নম্বর ক্রমিকের কাওছার আহমেদ দুজন আপন ভাই—দুজনই সাংসদের ভাগনে। ৬ নম্বর ক্রমিকের মো. জুয়েল হোসেন সাংসদের বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজের অফিস সহায়ক। ৭ নম্বর ক্রমিকের রিয়াদ মৃধা সাংসদের নাতি। ৮ নম্বর ক্রমিকের মো. শাহদাৎ সাংসদের ফুফাতো বোনের ছেলে। ৯ নম্বর ক্রমিকের মো. ইউনুচ ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ওহাব আলীর ছেলে। ওহাব আলী সাংসদের চাচাতো ভাই—সেদিক থেকে মো. ইউনুচ সাংসদের ভাতিজা। ১০ নম্বর ক্রমিকের মো. হান্নান গাজী সাংসদের প্রতিবেশী। ১১ নম্বর ক্রমিকের মো. বশির উদ্দিন এবং ১৩ নম্বর ক্রমিকের মো. সাইদুর রহমান সাংসদের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। ১৪ নম্বর ক্রমিকের মো. শহিদুল ইসলামও সাংসদের ভাতিজা। ১৬ নম্বর ক্রমিকের জাহিদুল মৃধা সাংসদের নাতি। ১৮ নম্বর ক্রমিকের মো. আরিফুজ্জামান ও ১৯ নম্বর ক্রমিকের মো. তাইফুর রহমান—দুজন সাংসদের ভাতিজা। ২২ নম্বর ক্রমিকের জিয়া এবং ২৩ নম্বর ক্রমিকের আবু তাহের সাংসদের ব্যক্তিগত সহকারী মো. তরিকুল মৃধার ভাই। এঁরা তিনজনই আবার সাংসদের ভাতিজা। ২১ নম্বর ক্রমিকের মিন্টু ভূঁইয়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাহাদুর ভূঁইয়ার ছেলে। ২৪ নম্বর ক্রমিকের মো. নবুয়াত সাংসদের চাচাতো বোন কমলা বেগমের ছেলে (ভাগনে)।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংসদ মো. মহিব্বুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন ঘর পেয়েছে এটা ঠিক নয়। তবে উপকারভোগীদের অনেকেই প্রতিবেশী এ কথা সত্য। যাঁদের নামে ঘরগুলো বরাদ্দ হয়েছে, তাঁরা সবাই গরিব বিধায় ঘর বরাদ্দ হয়েছিল।’ সাংসদ আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে আরও ৩০টি ঘর বরাদ্দ এসেছিল। সেগুলোও গরিবদের তালিকা করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৪৭২টি আবাসনের ঘর বরাদ্দ এসেছে। এই ঘরগুলোও নির্বাচনী এলাকার গরিবদের মধ্যে সমবণ্টন করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তালিকায় নাম রয়েছে, এমন একজন প্রকল্পের ঘর পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি ধুলাসার ইউনিয়নের পশ্চিম ধুলাসার গ্রামের বাসিন্দা মো. ইউসুফ। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘হুনছি আমার নাম তালিকায় আছে। অথচ আমি ঘর পাইনি। আমার ঘরটা গেল কই?’

বিজ্ঞাপন

নকশা পরিবর্তন করে প্রকল্পের ঘর তৈরির অভিযোগে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে সত্যতা মিলেছে। অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী এসব গৃহের দুটি কক্ষের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট হওয়ার কথা। এর সঙ্গে ৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬ ফুট প্রস্থের একটি রান্নাঘর, ৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬ ফুট প্রস্থের শৌচাগার এবং ৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬ ফুট প্রস্থের বারান্দা রাখার কথা। সরেজমিনে দেখা গেছে, কেউ কেউ অনুমোদিত নকশার পাল্টিয়ে তাঁদের আগে থাকা ঘরের সঙ্গে যুক্ত করে বরাদ্দ পাওয়া নতুন দুটি ঘর তুলে বড় বাড়ি করেছেন। এ ছাড়া ধুলাসার মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন মো. শহিদুল্লাহর ঘরটির ৩০ শতাংশ এবং মধ্য ধুলাসার গ্রামের কাওছার আহমেদের ঘরটির অর্ধেক কাজ সম্পন্ন করে এ দুটি ঘর বহুদিন ধরে ফেলে রাখা হয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন।
কলাপাড়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. হ‌ুমায়ুন কবীর বলেন, এ প্রকল্পের বিষয়গুলো ওই সময়ে যে পিআইওর দায়িত্বে ছিলেন তিনিই জানবেন। প্রকল্পে নকশা পাল্টানোর সুযোগ নেই। ওই সময়ে কাজ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। এখন এ নিয়ে তাঁদের কিছু করার আছে কি না, জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’
গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের উপজেলা কমিটির সভাপতি ও কলাপাড়ার ইউএনও আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদুল হক বলেন, ‘আসলে আমি এখানে নতুন। এ বিষয়টি আমার জানা নেই।’

মন্তব্য পড়ুন 0