বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রামু হামলার ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী আপনি, সেদিন কী দেখেছিলেন?

তরুণ বড়ুয়া: উত্তম কুমার বড়ুয়া নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডিতে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার কিছু ছবি প্রকাশিত হয়। এ কথা ছড়িয়ে পড়তেই সেদিন বিকেলে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে রামুর চৌমুহনী স্টেশনে জমায়েত হতে থাকে লোকজন। সন্ধ্যা সাতটার দিকে বিভিন্ন জায়গা থেকে গাড়িতে করে লোকজন আনা শুরু হয়। সবার মুখে উসকানিমূলক স্লোগান। রাত আটটার দিকে ফেসবুকের সেই উত্তম বড়ুয়ার বাড়ির দিকে যায় একটি মিছিল। উত্তমকে না পেয়ে তাঁর ঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালায় ওরা। রাত ১০টার দিকে চৌমুহনীতে কয়েক হাজার লোকে ভরে যায়। তখনো বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল আসছিল। সবার হাতে লাঠিসোঁটা, দা-কিরিচ, বল্লম ইত্যাদি। রাত ১১টা পর্যন্ত আমি চৌমুহনীতে ছিলাম। আমার ওপর ইটপাটকেল ছোড়া হয়। কয়েকজন মুসলিম বন্ধু আমাকে হামলা থেকে রক্ষা করেছিলেন। বেসামাল পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ আতঙ্কিত, নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। উপায় না দেখে এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করে তখন আমরা জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, রাজনৈতিক দলের নেতাদের সহযোগিতা চেয়েছিলাম, কেউ এগিয়ে আসেননি। তখন বিদ্যুৎ ছিল না, সবখানে অন্ধকার। এমন পরিস্থিতিতে দুর্বৃত্তরা প্রথমে সাদাচিং বিহারে আগুন দিল। এরপর লাল চিং বিহার, এরপর মেরংলোয়া গ্রামে উত্তম বড়ুয়ার শ্বশুরবাড়িসহ ১২-১৩টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর পাশের সীমাবিহারে আগুন দেয়। তখন এসব রক্ষার কেউ ছিল না। যে যেভাবে পারে হামলা, ভাঙচুর আর লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে তখন রামুর ৮-১০ হাজার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ-শিশু ঘরবাড়ি ফেলে ধানখেতে লুকিয়েছিল। কিছু নারী-শিশুকে স্থানীয় মুসলিম লোকজন বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আমার পরিবারের ৫০ জনের কেউ বাড়িতে ছিলাম না। মুহূর্তের মধ্যে আগুনে পুড়ে শেষ হলো ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার। সারা রাত তাণ্ডব চলল, অথচ কেউ এল না। তবে হামলাকারীরা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো নারীর গায়ে হাত দেয়নি। অন্যদিকে বৌদ্ধদের ঘরবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চললেও পল্লির ভেতরে থাকা মুসলিম বাড়িগুলো ছিল সুরক্ষিত। এতে বোঝা যায়, হামলা যারা করেছিল, তারা চেনাজানা লোক। হামলার ঘটনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। হামলার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, সেটা বলতে পারব না।

default-image

বৌদ্ধবিহারগুলোর এখন কী অবস্থা, নিরাপত্তা কেমন?

তরুণ বড়ুয়া: হামলার পরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামুতে এসেছিলেন, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে দাঁড়ান। দ্রুত সময়ে পুড়ে যাওয়া বিহারগুলো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেন। এক বছরের মাথায় প্রায় ২২ কোটি টাকা খরচ করে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের ওপর ১২টি দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করে দেন শেখ হাসিনা। এ জন্য আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। ঐতিহাসিকভাবে রম্যভূমিখ্যাত রামু ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি পীঠস্থান। এখানে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম আমরা এক পরিবারের মতো ছিলাম। এখনো আছি। শুধু ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর একটিমাত্র দিন সেই সম্প্রীতি নষ্ট হয়েছিল মুষ্টিমেয় কিছু উগ্রবাদীর হামলার কারণে। কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য পরিকল্পিতভাবে বৌদ্ধপল্লিতে হামলা চালিয়েছিল। নতুন বৌদ্ধবিহার আমরা পেয়েছি। কিন্তু ৫০০ বছর আগের মূল্যবান ধাতু, দলিল, বুদ্ধমূর্তি, কষ্টিপাথরের মূর্তি—এসব তো আর ফিরে পাব না। নিরাপত্তা থাকলেও কারও মনে শান্তি নেই। ধর্মীয় অস্তিত্বে আঘাত হানলে যা হয়।

আদালতে বিচার চলছে, সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন না কেন?

তরুণ বড়ুয়া: কেন যাব? কার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব আমরা? সে রাতে যারা বৌদ্ধবিহারে হামলা চালিয়েছিল, অগ্নিসংযোগ করেছিল, সবার ছবি তখন ফেসবুকে, জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। হামলার আগে তারা মিছিল-মিটিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তদন্তের সময় আমরা হামলাকারীদের নামধাম পুলিশকে দিয়েছিলাম, হামলার ঘটনার ছবিও দিয়েছিলাম। কিন্তু আদালতে দাখিল করা পুলিশের অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) তাদের একজনের নামও নেই। যারা হামলা করেনি, তাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা আদালতে গিয়ে কার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব? মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে তখন শত্রুতা আরও বাড়বে।

default-image

তাহলে ন্যায়বিচার আশা করবেন কীভাবে?

তরুণ বড়ুয়া: আমরা জানি, রামু হামলার বিচার পাবেন না সংখ্যালঘুরা, আশাও করি না। আমরা ঘটনাটা জিইয়ে রাখতে চাই না। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। যারা বিহারে হামলা করেছিল, অগ্নিসংযোগ চালিয়ে সবকিছু ধ্বংস করেছে, আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। হামলার বিচারও চাই না। ক্ষমাই মহত্ত্বের লক্ষণ। এখন আদালত মামলাগুলো ডিসমিস করে দিলে পারেন।

কিন্তু সারা দেশের মানুষ এত বড় হামলার বিচার কী হয় দেখার অপেক্ষায়...

তরুণ বড়ুয়া: লাভ হবে না। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে এ পর্যন্ত যতগুলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে, কোনোটার বিচার হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি-ফেসবুক ব্যবহার কিংবা গুজব ছড়িয়ে দেশের প্রথম হামলা হয়েছিল রামুতে। এরপর চট্টগ্রামের পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফেসবুক গুজব ছড়িয়ে মন্দিরে, সংখ্যালঘুর বাড়ি কিংবা সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর হয়েছে। রামু হামলার বিচার হলে এত সব হামলার সাহস পেত কি না, সন্দেহ আছে।

মামলার সব আসামি জামিনে মুক্ত, হুমকি-ধমকি আছে কি না?

তরুণ বড়ুয়া: মোটেও নেই। কারণ, ওরা হামলায় জড়িত ছিল না। তারা জানে, মামলায় তাদের নাম বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কেউ সরবরাহ করেনি। পুলিশ ইচ্ছা করে তাদের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রামুতে একটা ফায়ার সার্ভিস হয়েছে, বিজিবির ব্যাটালিয়ন হয়েছে। আস্থার সংকট দূর করতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের নিবিড় যোগাযোগ হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি এলাকায় আসে, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের খোঁজখবর রাখছে। সীমাবিহারের পাশে বিজিবির একটি অস্থায়ী ক্যাম্পও আছে। কিন্তু ধর্মীয় অস্তিত্বে আঘাত হানায় মনে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, তা মুছে ফেলা যাচ্ছে না কিছুতেই।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন