default-image

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর, ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে সংঘর্ষের প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের সহিংসতার ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের দুই সদস্য বাদী হয়ে আজ শনিবার বেলা তিনটার দিকে সদর থানায় মামলা তিনটি করেছেন।

এর আগে গতকাল শুক্রবার রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত জেলা শহরের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে ১৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো মাদ্রাসাছাত্র নেই। হামলায় অংশ নেওয়া বহিরাগতদের আটক করা হয়েছে।

এদিকে আজ বেলা একটার দিকে জেলা শহরের টিএ রোড ও ঘোড়াপট্টি সেতু এলাকায় শহরের কান্দিপাড়াস্থ জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকেরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। সেখানে বাংলাদেশ হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা সাজিদুর রহমান নেতৃত্ব দেন। বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেন, গতকাল মাদ্রাসার ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু সে সময় বহিরাগতরা মিছিলে ঢুকে জেলাজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে। এর নিন্দা জানান তিনি। সমাবেশে কাল রোববার হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হরতাল পালন করা হবে বলে তিনি জানান।

বিজ্ঞাপন

সদর থানা সূত্রে জানা গেছে, জেলা শহরের মেড্ডা পীরবাড়ি এলাকায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উপপরিদর্শক (এসআই) মুসলেহ উদ্দিন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। আটক ১৪ জনকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। আর দাতিয়ারাস্থ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে নাশকতা এবং ২ নম্বর ফাঁড়ির পরিদর্শক মোহাম্মদ নুর আলমকে মারধরের ঘটনায় এসআই মিজানুর রহমান বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি এবং হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আরেকটি মামলা করেন। উভয় মামলায় তিনি চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করেন।

স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, মোদিবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাজুড়ে কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা গতকাল বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা পর্যন্ত সহিংসতা চালান। মাদ্রাসাছাত্রদের সঙ্গে ১৫ থেকে ২২ বয়সী কিশোর-তরুণেরাও তাণ্ডবে অংশ নেন। বিকেল চারটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, পুলিশ সুপার কার্যালয়সহ ছয়টি সরকারি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। জেলা সার্কিট হাউসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরসহ ভেতরে থাকা জেলা প্রশাসনের ১০টি গাড়ি এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ভাঙচুর করেন।

আজ সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তাণ্ডবের শিকার বিভিন্ন দপ্তরে সরেজমিনে দেখা যায়, আগুনে পুড়ে যাওয়া জিনিস পড়ে আছে। কাউতলী এলাকায় জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর নিচতলার দুটি কক্ষ এবং দ্বিতীয় তলায় ভিআইপিদের জন্য নির্মিত তিনটি কক্ষ আগুনে পোড়ানো হয়। আগুনের ধোঁয়ায় ২ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির সামনের অংশ কালো হয়ে গেছে। কার্যালয়ের সামনে পুড়ে যাওয়া পাঁচটি মোটরসাইকেলের অংশবিশেষ, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের গ্যারেজে সিআইডির এসপির ব্যবহৃত গাড়িসহ পাঁচটি গাড়ি, সাতটি মোটরসাইকেলের পোড়া অংশবিশেষ, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একটি গাড়ির অংশবিশেষ, নিচতলার পোড়ার অংশবিশেষ ও মৎস্য কার্যালয়ের গ্যারেজে মৎস্য কর্মকর্তার পোড়া গাড়ি পড়ে আছে।

আর সার্কিট হাউসে গিয়ে জেলা প্রশাসনের ১০টি গাড়ির চারপাশের ভাঙা অংশবিশেষ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। গণপূর্তের প্রধান ফটক, সাইনবোর্ড ও ভেতরে চারপাশের বাতি ও ভবনের জানালার কাচ ভাঙার অংশ পড়ে আছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) কার্যালয়ের প্রধান ফটক ও সাইনবোর্ড ভাঙচুর করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সওজের চৌকিদার আলভার্ট পিনারো প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০০ থেকে ২০০ মাদ্রাসাছাত্র ভেতরে ঢুকে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। জাতীয় পতাকা নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে।’

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা সাজিদুর রহমানের ভাষ্য, ‘মাদ্রাসার ছাত্ররা এসব করেনি। আমাদের সঙ্গে বহিরাগতরা ঢুকে এই অন্যায় কাজগুলো করেছে। আমরা এগুলোর নিন্দা জানাই। আমরা শান্তিপূর্ণ মিছিলে বিশ্বাস করি। যারা বিশৃঙ্খলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করছে, তারা আমাদের লোক না।’

মাদ্রাসাছাত্ররা আজ বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল করবেন জানিয়ে এই হেফাজত নেতা বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসাগুলোর কেন্দ্রীয় পরীক্ষা চলছে। অনেক এলাকার মাদ্রাসার ছাত্ররা এখানে এসেছে। কোন ছাত্ররা এসব করছে, আমরা বলতে পারছি না। আমরা চেষ্টা করেছি নিয়ন্ত্রণ করতে। গতকাল ছুটির দিন ছিল। আর ওস্তাদদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন না। এসব জানার পর জামিয়ার ছাত্রদের সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি।’ ২০১৬ সালেও একইভাবে রেলস্টেশনে হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কে বা কারা করেছে, এগুলো তদন্ত করা হোক। তদন্ত করে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করা হোক।’

জেলায় ৬ প্লাটুন বিজিবি ও ৬০০ পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন