বিজ্ঞাপন

আকলিমা বেগম বলেন, ‘২৭ মার্চ বিকেলে ছেলে বলেছিল, “মা আমাকে খাইয়ে দিয়ো।” নামাজের সময় হওয়ায় ভাত খাওয়াতে পারিনি। ওই দিন খেয়েছে কি না, জানি না। জানতাম না যে ছেলেকে আর কোনো দিন ভাত খাওয়াতে পারব না। আসাদুল্লাহ নিজে নিজে ভাত খেতে পারত না। ছেলেকে খুব মনে পড়ে। ছেলের আম্মু ডাকটাই খুব মনে পড়ে। “আম্মু ভাত খাইয়ে দাও”, কথাটাই শুধু কানে বাজে। ছেলে আমার জন্য ওষুধ আনতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছেলে নেই, সবাই দেখতে পারবে। কিন্তু মনের মধ্যে হাহাকার কেউ দেখতে পারবে না। রমজান মাসে এক দিনও ঘুমাতে পারিনি। বুকের রক্ত পানি করে ছেলেকে বড় করেছি। তাদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ মারা গেছে। কত মায়ের বুক খালি হয়েছে। পরিবেশ–পরিস্থিতি সবই ঠিক হবে। এখন সবাই তো ভালো আছে। কিন্তু আমার ছেলে তো আর ফিরে আসবে না।’
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কুমিল্লা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন আকলিমা বেগম। বলেন, ‘চিকিৎসার অভাবে ছেলে আমার মারা গেছে।’

বৃহস্পতিবার দুপুরে সদর উপজেলার বড়বাকাইলে গিয়ে দেখা যায়, নিহত কামাল মিয়ার মা হোসনা বেগম টিনের জরাজীর্ণ ঘরে নামাজ পড়ছিলেন। কামালের প্রসঙ্গ উঠতেই কাঁদতে শুরু করেন তিনি। হোসনা বেগম বলেন, এক মাস রোজা গেছে। ছেলে থাকলে কত কিছু দিত, ঈদের কাপড় দিত। ছেলে নেই, আনন্দও নেই। কামালের বড় ভাই মাসেদ মিয়া বলেন, কামাল শান্ত স্বভাবের ছিল। ভাই না থাকার ব্যথা কাউকে বোঝানো যাবে না।

গত ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের নন্দনপুর বাজারে পুলিশ-বিজিবি এবং হেফাজতে ইসলাম ও স্থানীয়দের সঙ্গে সহিংসতার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বুধল ইউনিয়নের হারিয়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম ওরফে জারু মিয়া। বৃহস্পতিবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল সুনসান নীরবতা। শিশুছেলে মো. ইসমাইল (৮) ও ইসরাইল (৩) ও মেয়ে খাদিজা বেগমকে (৫) নিয়ে স্বামীর জরাজীর্ণ ঘরে বাস করছেন রোজিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘সন্তানদের বাবা নেই। ওদের বাবা থাকলে মার্কেটে নিয়ে যেত, কাপড় কিনে দিত। বাচ্চাদের মুখে হাসি থাকত। ঈদের দিন আনন্দ করত। গ্রামের অন্য শিশুরা তাদের বাবার সঙ্গে গেলে আমার শিশুরা তাকিয়ে থাকে।’ রোজিনা বেগম বলেন, ‘এখন সংসারে যে ৫ টাকা আয় করবে, এমন কেউ নেই। একটা টিনের ঘরে থাকি। চতুর্দিকেই ভাঙা। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। কীভাবে সংসার চলবে, সন্তানদের পড়াশোনার খরচই–বা কোথায় থেকে আনব, এসব আমার জানা নেই। স্বামী চলে গেল, সাথে আমাকে অসহায় করে দিয়ে গেল।’

default-image

২৭ মার্চ সন্ধ্যায় কান্দিপাড়া জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার সামনে কোমরের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তরুণ মো. মোশাহিদ মিয়া (১৯)। তিনি মারা যাওয়ার সাত থেকে আট মাস আগে সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন। ছেলের মৃত্যুর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারছেন না মা–বাবা। মোশাহিদের বাবা নূর আলম বলেন, ‘কীভাবে ঈদের আনন্দ করব? আজ ছেলে বেঁচে থাকলে কত আনন্দ–উল্লাস করত। ছেলের এমন মৃত্যু কামনা করিনি। পরিবারের সবাই ছেলের জন্য কাঁদে। কারও মনেই ঈদের আনন্দ নেই।’

২৮ মার্চ সহিংসতার সময় বেলা ১১টায় পৈরতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান যুবক আশিকুল ইসলাম (৩১)। তিনি পৌর শহরের গোকর্ণঘাট এলাকার মৃত রাকিব মিয়ার ছেলে। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে আশিকুল সবার বড় ছিলেন। তিন বোনের বিয়ে হয়েছে। আশিকুল ঢাকার রায়েরবাজার এলাকায় স্কুলের ব্যাগ তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। করোনার কারণে চাকরি হারিয়ে বাড়ি চলে এসেছিলেন। তাঁর মা সামসুন্নাহার বেগম বলেন, ‘যে ছেলে সংসার চালাত, বোনদের ঈদের কাপড় কিনে দিত, সেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। কিসের আনন্দ, কিসের ঈদ। সবাই আশিকের জন্য দিনভর কান্না করে। রোজার এমন এক দিনও যায়নি যে ছেলের জন্য কান্না করিনি।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলাম ও এর পক্ষের লোকজন পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন। ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনের সহিংসতায় বেশ কয়েকজন নিহত হন। নিহতের সংখ্যা ১৩, ১৫ নাকি ১৬, তা নিয়ে আছে সংশয়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কখনো ১৩ জন উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কখনো নিহতের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিন দিনের সহিংসতায় নিহত ১৫ জনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এসব ঘটনায় ৫৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত হেফাজতের নেতা-কর্মীসহ ৪৬৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বদলি করা হয়েছে পুলিশের পাঁচ কর্মকর্তাকে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন