বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত শুক্রবার বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, দুই দিন আগে পুকুরের পাড় সংক্ষণে যে প্রতিরক্ষাদেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছিল, সেটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর শুরু হয় পুকুর রক্ষা প্রকল্পের কাজ। এ অবস্থায় পরিবেশবাদী সংগঠন বলছে, সরকারি পুকুর রক্ষা করতে গিয়ে যদি প্রকল্প গোটাতে হয়, তাহলে ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর রক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দুর্যোগ ছাড়াও যেকোনো সরকারি স্থাপনার জন‍্য ওয়াটার বডির প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট সিলেট কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি রাজন দাশ। তিনি বলেন, ‘আমি ওই স্থান দেখেছি। সেখানে হাসপাতালের জন‍্য বহুতল ভবন হলেও কিন্তু একটি ওয়াটার বডি হিসেবে পুকুর সংরক্ষণ দরকার। তা না করে পুকুরটি আগে থেকেই ভরাট করার কথা বলে জলাধার সংরক্ষণে অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ করা হলো।’

পুকুর রক্ষা প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের এই পুকুরসহ অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা চারটি পুকুর রক্ষায় ইসলামিক রিলিফের অর্থায়নে সংরক্ষণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন চূড়ান্ত করা হয়। প্রকল্পের পুরোটাই দুর্যোগকালীন। অগ্নিকাণ্ড বা বড় কোনো দুর্যোগের সময় তাৎক্ষণিকভাবে পানির জোগান দিতে চারটি পুকুরে পানি ধরে রাখতে গভীর করে খনন ও পাড়ে প্রতিরক্ষাদেয়াল নির্মাণ করার কথা, যেখানে বছরজুড়ে পানি সংরক্ষিত থাকবে।

পুকুর রক্ষা প্রকল্পে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আছেন সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর এস এম শওকত আমীন। তিনি জানান, হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টারের পুকুরটি প্রকল্পভুক্ত করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সম্মতিপত্র (এনওসি) নেওয়া হয়েছিল।

প্রতিরক্ষাদেয়ালের নির্মাণকাজ তদারক করা সিটি করপোরেশনের এক কর্মী জানান, ১৫ শতক জায়গার পুকুরটিতে প্রথম ধাপে প্রায় ৫ লাখ টাকা গচ্চা গেল।

যোগাযোগ করা হলে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিমাংশু লাল রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই পুকুরে ২০০ শয্যার বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল হবে। সেখানে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ পানি রিজার্ভ করতে চেয়েছিল। এটি ভূমিকম্প কিংবা আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু আমরা সেটি না করে দিয়েছি।’

সম্মতি নেওয়ার সময় নিষেধ করা হলো না কেন, জানতে চাইলে হিমাংশু লাল রায় বলেন, ‘এখন আমরা তাদের বুঝিয়ে বলেছি। যে স্থানটি নির্বাচন করা হয়েছে, সেটি জুতসই জায়গা নয়। স্থানটি বিভাগীয় শিশু হাসপাতালের জন্য। করোনার কারণে সেটি এখনো দরপত্র প্রক্রিয়ায় যায়নি। আশা করছি শিগগির কার্যক্রম শুরু হবে।’

ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের প্রকল্প কর্মকর্তা (সিলেট) জাহিদুল হক জানিয়েছেন, প্রথম ধাপের কাজটি ছিল হাসপাতালের পুকুর সংরক্ষণ। সেটি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আপাতত চারটি পুকুর সংরক্ষণ প্রকল্পটি স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন বিকল্প হিসেবে আরও চারটি পুকুর চিহ্নিত করেছে। সেগুলোতে জরিপ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, ভূমিকম্পঝুঁকি ও অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলায় সিলেট শহরের ২৭টি ওয়ার্ডে ২৭টি পুকুর সংরক্ষণ দরকার। সিটি করপোরেশন তাদের এই পর্যবেক্ষণে একমত আছে।

সিলেটকে একসময় পুকুর-দিঘির শহর বলা হতো। তবে শহরে ঠিক কী পরিমাণ পুকুর-দিঘি আছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পুকুর, দিঘি, খালসহ সিলেট নগরে মোট জলাভূমির পরিমাণ ৫৪৮ দশমিক ৮ হেক্টর। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হিসাবে, শহরে শতাধিক পুকুর ও দিঘি আছে। তবে সিটি করপোরেশন বলছে, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানায় ২৮টি পুকুর-দিঘির অস্তিত্ব আছে।

এই ২৮ পুকুর-দিঘিরই একটি শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের পুকুরটি। ভবিষ্যতে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় পুকুর রক্ষা প্রকল্প গোটানোয় ক্ষুব্ধ বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০-এর ৩৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো পুকুর, জলাশয়, খাল, লেক ভরাট করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পুকুরটির রক্ষা থেকে সরে যাওয়া ও ভবিষ্যতে ভরাট করার পরিকল্পনা—দুটোতেই দেখছি, জলাধার সংরক্ষণ আইনের তোয়াক্কা করা হয়নি। এ অবস্থা যদি সরকারি পর্যায়ে হয়, তাহলে ব্যক্তিমালিকানার পুকুর রক্ষায় আইন প্রয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পের অর্থায়ন করেছে একটি বেসরকারি সংস্থা। প্রকল্পটি সিটি করপোরেশনের নিজস্ব হলে বরং এ নিয়ে লড়া যেত। পুকুরটি রক্ষায় বাধা পেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে আরেকটি পুকুর বেছে নিয়েছি। এ জন্য আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন