বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রতিদিন ২০ লিটার ঘোল বিক্রি হয় মিটলের। গরম, শীত সব সময় চলে। তবে গরমে একটু বেশি চলে। এক গ্লাস ঘোলের দাম মানভেদে ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা। প্রতিদিন তাঁর ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার বেচাবিক্রি হয়। এর পেছনে খরচ হয় ৩৫০-৪০০ টাকা। তবে করোনার পর থেকে তাঁর ব্যবসা কমেছে।

মিটলের দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই। মিটল বললেন, ‘নিয়মিত রাত তিনটায় উঠি। ঘোল বানিয়ে সাড়ে পাঁচটার সময় শহরের দিকে আসি। এখানে সকাল সাড়ে আটটা-নয়টা পর্যন্ত বসি। এরপর নিউমার্কেটে কিছু নিয়মিত ক্রেতা আছেন। তাঁদের ঘোল দিয়ে বাসায় যাই। যদি সব বিক্রি না হয়, তখন হেঁটে হেঁটে বিক্রি শেষ করতে হয়। বেলা ১টার দিকে বাসায় দুধওয়ালা দুধ দিয়ে যায়। এরপর সেগুলো জ্বাল দেওয়া ও অনান্য প্রক্রিয়াও আছে। দুপুরেই সন্দেশ, দানাদার, প্যাড়া সন্দেশ এসব শুকনা মিষ্টি তৈরি করি। বেলা সাড়ে পাঁচটার পর দৌলতপুরে ফুটপাতে একটি নির্ধারিত জায়গায় সেসব মিষ্টি বিক্রি হয়। রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে দোকান বন্ধ করি। ফিরে খেতে খেতে রাত ১২টা। এরপর আবার রাত তিনটায় ওঠা লাগে।’

খাওয়াদাওয়া কীভাবে হয়, জানতে চাইলে এক গাল হেসে দিয়ে মিটল বলেন, ‘খাওয়া নিয়ে প্যাড়া নাই। যা জোটে তাই খাই। আলু ভাত খাই। কখনো জাউ ভাত খাই। আবার কখনো দোকান থেকে এক প্লেট খিঁচুড়ি কিনে খেয়ে নিলাম। এমনও সময় আছে একটা পাউরুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম। জীবনে এই কায়দা করেই তো বাঁচতে হচ্ছে।’ একটু বিরতি নিয়ে আবার বলেন, ‘সবকিছু রান্না করতি পারি। তবে মাছটাছ তেমন কেনা হয় না। মাস গেলি পরে একদিন মাংস খাই। কষ্ট করে গিয়ে তারপর আর রান্না করতি ভালো লাগে না। আর বাড়িতে স্ত্রী–সন্তান রেখে ভালো–মন্দ খাওয়াও যায় না।’

রোজগার নিয়ে মিটলের খুব বেশি অতৃপ্তি নেই। তবে পড়ালেখা শিখতে না পারাটা ভীষণ পোড়ায় তাঁকে। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর আর পড়ালেখাটা করতে পারেননি। পড়ালেখার প্রসঙ্গ উঠতেই দুঃখভরা মুখ নিয়ে মিটল বলেন, ‘বাবা মিষ্টি বানিয়ে এলাকায় ফেরি করে বিক্রি করতেন। সংসারে খুবই অভাব ছিল। বলতে কষ্ট হয়, অনেক সময় দু–এক দিন না খেয়েই কেটেছে। ১১ ভাইবোনের অভাবের সংসারে পড়ালেখা হয় বলেন! বাবার তখন পড়াশোনা করানোর জন্য পাঁচটা টাকা দেওয়ারও কোনো উপায় ছিল না। আমরা যারা একসঙ্গে ওই ওয়ান-টুতে পড়েছি, তার মধ্যে দুজন পুলিশে চাকরি করে। একজন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ভাগ্যের ফেরে আমি পথে বসে ঘোল বিক্রি করছি।’

নিজে লেখাপড়া না শিখতে পারার আক্ষেপ মিটল পুষিয়ে নিতে চান তাঁর সন্তানদের মাধ্যমে। তাঁর বড় ছেলে অক্ষয় ঘোষ ক্লাস নাইনে পড়ছে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ–৫ পেয়েছে সে। আর ছোট ছেলে সাহিত্য ঘোষ দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। মিটল ঘোষ বলেন, ‘পথে–ঘাটে থেকে কামাই করে খাই। আমার ছেলেরা যেন একটু ভালো করে লেখাপড়া শিখে ভালো কিছু করতে পারে, তার জন্যই তো সবাইকে ছেড়ে এত কষ্ট করে যাচ্ছি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন