পেঁয়াজের খেত পরিচর্যায় ব্যস্ত দুই চাষি। সম্প্রতি পাবনার সাঁথিয়ার পুণ্ডুরিয়া গ্রামে
পেঁয়াজের খেত পরিচর্যায় ব্যস্ত দুই চাষি। সম্প্রতি পাবনার সাঁথিয়ার পুণ্ডুরিয়া গ্রামেপ্রথম আলো

পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের খবর প্রচার হতেই পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করে। অবশেষে প্রায় সাড়ে তিন মাস পর আজ শনিবার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হতেই পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। সপ্তাহখানেক আগে নতুন দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল প্রতি কেজি ৪০ টাকার কাছাকাছি (পাইকারি)। আজ সাঁথিয়ার বিভিন্ন বাজারে পাইকারি প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকায়।

এই অবস্থায় সাঁথিয়ার পেঁয়াজচাষিরা চরম বিপাকে পড়ে গেছেন। এমন দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে তাঁদের লোকসান হচ্ছে। ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বাড়লে চাষিদের লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হবে। উপজেলার পেঁয়াজচাষিরা তাই শঙ্কায় দিন পার করছেন।

চাষিরা জানান, দেশি পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে। এই অবস্থায় ‘পেঁয়াজের ভান্ডার’ বলে খ্যাত পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পেঁয়াজচাষিদের ব্যস্ততার শেষ নেই। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় উপজেলায় এবার প্রচুর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে। পেঁয়াজচাষিরা ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজবীজের দানা এবার ৬ হাজার টাকায় কিনেছেন। এতে উৎপাদন খরচ ব্যাপক বাড়লেও তাঁরা পেঁয়াজের আবাদ থেকে পিছিয়ে যাননি।

কৃষকদের দাবি, বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হওয়ায় এবার দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজেই অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ হবে। কিন্তু এমন অবস্থার মধ্যেও শুরু হয়েছে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি। আমদানি শুরু হতেই পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। এতে কৃষকদের মোটা অঙ্কের লোকসান হওয়ায় পেঁয়াজ চাষ থেকে তাঁরা আবারও পিছিয়ে যাবেন। তাই ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের দাবি করে আসছেন কৃষকেরা।

বিজ্ঞাপন

পেঁয়াজচাষিরা জানান, সাঁথিয়া উপজেলায় পেঁয়াজের আবাদ হয়ে থাকে দুই পদ্ধতিতে। এর একটি হলো আগাম বা মূলকাটা ও অপরটি হলো হালি। মূলকাটা পদ্ধতিতে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পেঁয়াজের আবাদ করে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে পেঁয়াজ ঘরে তোলা হয়। এই পদ্ধতিতে অঙ্কুরিত পেঁয়াজ জমিতে রোপণ করা হয়। মূলকাটা পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। অন্যদিকে, হালি পদ্ধতিতে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে পেঁয়াজের আবাদ করে মার্চ-এপ্রিলে পেঁয়াজ ঘরে তোলা হয়। এই পদ্ধতিতে পেঁয়াজের চারা জমিতে রোপণ করা হয়। হালি পেঁয়াজ দীর্ঘদিন ঘরে সংরক্ষণ করা যায়।

default-image

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর ১৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছিল। এবার ১৬ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

কৃষক ও উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পেঁয়াজের আবাদে এর আগে কৃষকেরা বছরের পর বছর লোকসান দিয়েছেন। কিন্তু গতবার তাঁরা লাভের মুখ দেখেন। গতবারের মতো লাভ হতে পারে ভেবে কৃষকেরা এবার পেঁয়াজের আবাদে ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়েছেন। কৃষকদের এবার পেঁয়াজবীজের দানা পাঁচ-ছয় গুণ বেশি দামে কিনতে হয়েছে। শ্রমিকের মজুরি, সেচ খরচসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল্য বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ এবার ব্যাপক বেড়েছে। এরপরেও এবার প্রচুর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে।

এদিকে, মাসখানেক হলো বাজারে আগাম বা মূলকাটা জাতের নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। নতুন পেঁয়াজ ওঠায় এমনিতেই পেঁয়াজের দাম বেশ কমেছে। এরই মধ্যে গত ২৮ ডিসেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এতে আরও বেশি কমতে শুরু করে পেঁয়াজের দাম। গতকাল থেকে ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি শুরু হতেই পেঁয়াজের দাম কমে যায়। চাষিরা জানান, তাঁরা হিসাব করে দেখেছেন, এবার প্রতি কেজি পেঁয়াজে উৎপাদন খরচ পড়েছে ৩৫ টাকার কাছাকাছি। অথচ ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির খবরে গতকাল সাঁথিয়ার বিভিন্ন হাটে পাইকারি প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ২২ থেকে ২৫ টাকায় নেমে যায়। ফলে এখনই চাষিদের প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে।

আজ শনিবার উপজেলার করমজা চতুরহাটে গিয়ে প্রচুর নতুন পেঁয়াজের আমদানি দেখা গেছে। হাটে পেঁয়াজ নিয়ে আসা ধুলাউড়ি গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সমিতির থ্যা সুদের ওপর ঋণ নিয়্যা বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করিছি। লাভের মুখ দেখার আশা করিছিল্যাম। কিন্তু ভারতের পেঁয়াজ আইস্যা আমাগরে সর্বনাশ কইর‌্যা দিল।’

করমজা চতুরহাটের পেঁয়াজের আড়তদার আব্দুল মুন্নাফ বলেন, ‘এই হাটেই কৃষকেরা পেঁয়াজের ন্যায্য দাম না পায়া একসময় কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গ্যাছে। ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি শুরু হওয়ায় আবারও মনে হয়, সেই অবস্থা ফির‌্যা আসতেছে। ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির খবরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরের পেঁয়াজ ৯০০ থেকে ১১০০ টাকায় নাইম্যা আসিছে। না জানি সামনে আরও কী আছে।’

সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জীব কুমার গোস্বামী বলেন, এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে। পেঁয়াজের ফলনও হয়েছে খুব ভালো। এবার প্রতি বিঘায় কৃষকেরা ৬০ থেকে ৬৫ মণ পেঁয়াজ পাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন