ঈদ মৌসুমের পাদুকাশিল্পের ভালো–মন্দ জানতে কথা হয় ভৈরব পাদুকা মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আল আমিন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো কারণ নয়, শুধু উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের প্রতি জোড়ায় জুতার উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৫০ টাকা। এই খরচের ধাক্কা নম্বর জুতা উৎপাদকেরা সামলাতে পারলেও লোকাল উৎপাদকেরা পারেননি। এককথায় লোকাল জুতার লাভ খাইয়া ফালাইছে কেমিক্যাল (উপকরণ)।’

জুতার শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ভৈরবের উৎপাদিত জুতার পরিচিতি এখন দেশজুড়ে। কয়েক বছর ধরে দেশের বাইরেও বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে ভৈরবের জুতার চাহিদা বাড়ছে। দেশের বাজারও বড় হচ্ছে।

default-image

এবার কম দামের জুতা দর ছিল ডজনপ্রতি ১ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। দামি জুতার দর গেছে ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা। কম দামের জুতার বাজার পড়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে কথা হয় অন্তত ২০ জন কারখানা মালিকের সঙ্গে। তাঁদের ভাষ্য, এবার রমজান শুরুর আগের মাসে কম দামের জুতা উৎপাদকদের ব্যবসা চাঙা ছিল। বিশেষ করে শবে বরাতের আগের সপ্তাহ থেকে রমজানের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চাঙা ভাব ধরে রাখতে পেরেছিলেন উৎপাদকেরা। এরপর থেকে প্রতিদিন ব্যবসা পড়তে থাকে।

ভৈরব পাদুকা মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক সবুজ মিয়া বলেন, ‘এবার বাজারের আচরণ বোঝা কঠিন। লোকাল মালের বাজার একদম পড়ে গেল। আবার নম্বর মাল ব্যবসা পেল।’ তিনি বলেন, লোকজনের হাতে হয়তো টাকা আছে। সেই কারণে এবার ক্রেতাদের নজর গেছে দামি জুতায়। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় লোকাল জুতার সঙ্গে নম্বর জুতার মূল্যের পার্থক্য কমে গেছে। সেই কারণেও ক্রেতার রুচির হয়তো পরিবর্তন হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে একসঙ্গে ৫০০ পাদুকা কারখানা নিয়ে বিপণিবিতান হাজী মার্কেট। সেখানকার নিউ রাজ পাদুকা কারখানার বয়স দেড় যুগ। মালিক মামুন মিয়ার মন ভালো নেই। এবার রমজানের প্রথম সপ্তাহ থেকে কম দামের জুতার বাজার পড়ে যাওয়ায় ঈদ মৌসুমের ব্যবসা পাননি তিনি।

বিপণিবিতানটির অবস্থান ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক লাগোয়া উপজেলা পরিষদ ভবনের বিপরীতে। এই বিপণিবিতানের চার পাশের তিন কিলোমিটার এলাকার মধ্যে রয়েছে আরও তিন হাজার কারখানা।

default-image

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে হাজী মার্কেটে দেখা যায়, বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। মালিকপক্ষের প্রায় সবার নজর হিসাবের খাতায়। মালিক-শ্রমিকেরা জানান, ২৭ রমজানকে জুতার শিল্পে ‘চানরাত’ বলে থাকেন তাঁরা। মূলত ওই রাতে উৎপাদন গুটিয়ে আনা হয়। গতকাল ছিল চানরাতের দিন। শ্রমিকেরা শেষ দিনের কাজ দ্রুত গুছিয়ে এনে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মালিকপক্ষের ব্যস্ততা আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো নিয়ে।

ওই মার্কেটে বিএম শুজ নামে একটি কারখানায় দেখা যায়, তিনজন শ্রমিক জুতা তৈরি করছেন। অন্যরা উপার্জিত অর্থ নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। মালিক হাবিব মিয়া বলেন, ‘জুতার প্রধান উপকরণ রেক্সিন, আঠা, পেস্টিন। একটি জুতা তৈরি হতে আপার, সোল, ফিটিং, ফিনিশিং, স্ক্রিন প্রিন্ট এই পাঁচ ধরনের কারিগরের হাত লাগে। পরে প্যাকেট ভর্তি করে বাজারজাত করা হয়। রমজান আসতেই প্রধান উপকরণসহ সব ধরনের কাঁচামালের মূল্য দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ফলে সব খরচ মিটিয়ে কম দামের জুতা তৈরি করে আর কম দামে বিক্রি করা যায়নি। ফলে বাজার হারাতে হয়েছে।’

ছিল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

জুতা ব্যবসায়ীরা বলেন, সারা দেশের পাইকারেরা রমজান শুরুর আগেই কিছু জুতা স্টক করে ফেলেন। রমজানের প্রথম সপ্তাহে ওই পরিমাণ জুতা বিক্রি শেষ হয়ে যায়। পরে ওই জুতা ফের কিনতে এসে জানতে পারেন দাম অনেকটা বেড়ে গেছে। দাম বাড়ার পর ক্রেতারা ওই জুতা থেকে নজর সরিয়ে বিকল্প জুতা কেনেন।

রমজানে কাঁচামালের মূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার কারণ সিন্ডিকেট ব্যবসা। পাদুকাশিল্পে সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ কাঁচামাল আমদানিকারকেরা। বেশির ভাগ কাঁচামাল আসে চীন থেকে। এবার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁরা চীন থেকে আমদানি করার পর মজুত করে ফেলেন। পরে দাম বাড়িয়ে বাজারে ছাড়েন। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কম দামের জুতা তৈরিতে। বিপরীতে অধিক মূল্যে কাঁচামাল কিনলেও দামি জুতায় মূল্য পাওয়া যাওয়ায় লাভের জায়গাটিতে খুব বেশি প্রভাব পড়েনি।

কাঁচামালের মূল্য বাড়ার কারণ জানতে কথা হয় কাঁচামালের দোকানির সঙ্গে। ভৈরবের পাদুকা কারখানার আধিক্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কাঁচামালের দোকানও। সংখ্যাটি এখন ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পৌর শহরের কমলপুর এলাকায় অবস্থিত শুধু জামান মার্কেটে কাঁচামালের দোকানের সংখ্যা শতাধিক। এর একটি মা এন্টারপ্রাইজ। দাম বাড়ার কারণ জানতে কথা হয় মালিক বরকত উল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতি আইটেমের দাম বেড়েছে দ্বিগুণের কাছাকাছি। দামের এমন উচ্চ লাফ এর আগে আর দেখা যায়নি। সিন্ডিকেট এই ব্যবসাটিকে এবার কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বেশি দামের কারণে এবার তাঁরা ঈদ মৌসুমের ভালো ব্যবসা পাননি। বিশেষ করে এবার তাঁরা কারখানামালিকদের বাকিতে বিক্রি করে বিপাকে আছেন। কারণ কারখানামালিকেরাও লাভ করতে না পারায় এখন তাঁরা ফোন বন্ধ করে বসে আছেন। চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারছেন না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন