বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবাসিক হল বন্ধ থাকার সুযোগে এবার মেসেও অভিভাবকদের রাত কাটানোর জন্য টাকা নেওয়া হয়েছে। প্রতি রাতের জন্য মেসের বেড শেয়ার করলে দিতে হয়েছে ২০০ টাকা, সিঙ্গেল সিটে ঘুমানোর জন্য ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। শহরের আবাসিক হোটেল সংগঠন সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী শহরে ৬০-৬৫টি আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেগুলোয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ লোকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আর মহানগর মেসমালিক সমিতির সভাপতি এনায়েতুর রহমান জানান, রাজশাহী শহরে মেসবাড়িগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ২৫ হাজার জন।

এই শহরে কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকায় কুমিল্লা থেকে আজ ভোরে মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন আনোয়ার হোসেন। সকালে মেয়ে জান্নাতুল যখন পরীক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন বাবা আনোয়ার হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ একাডেমিক ভবনের সামনে বসে ঝিমাচ্ছিলেন। চোখেমুখে তাঁর ঘুম। তিনি বলেন, ‘নিজের ঘুমের কথা বাদই দিলাম। মেয়ে যে কীভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে ঘুমচোখ নিয়ে?’ তিনি আরও বলেন, তাঁরা আজ ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর গেটে নামেন। পরে সেখানেই আধা ঘণ্টার মতো বসে থেকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে খেয়ে নয়টার দিকে মেয়েকে পরীক্ষার হলে দিয়ে এখানে বসে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিভাগীয় শহরে পরীক্ষার ব্যবস্থা করলে খুব ভালো হয় বলে তিনি জানালেন।

বেলা একটার দিকে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মেয়েকে নিয়ে ইজিবাইকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন রোকেয়া আক্তার (৪০)। তাঁদের বাড়ি খুলনায়। রাজশাহী নগরে কোনো হোটেলের সিট না পেয়ে ৪ অক্টোবর তাঁরা নিরুপায় হয়ে দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছিলেন। আজ মেয়ের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আজই ফিরে যাবেন খুলনায়। তিনি বলেন, এমন ভোগান্তিতে পড়েছেন, তাঁদের ধারণার বাইরে। অটোরিকশার ভাড়া ৮ টাকার জায়গায় ৪০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। তবু খালি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মা-মেয়ে হেঁটে তালাইমারীতে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আরও বলেন, যে আত্মীয়ের বাড়িতে তাঁরা উঠেছিলেন, সেখান থেকে খাওয়াদাওয়া করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু তাঁরা বাইরেই খেয়েছেন এই কয়েক দিন। কারণ, রিকশা-ইজিবাইকের ভাড়ার মতোই বাজারের সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। আত্মীয়দের আর ব্যয় বাড়াতে চাননি। হোটেলে তাঁদের ২০ টাকার খিচুড়ির সঙ্গে একটি ডিমভাজি খেতে হয়েছে ২৫ টাকা দিয়ে।

default-image

পরীক্ষা শেষেও রেহাই পাননি টাঙ্গাইলের ভর্তি-ইচ্ছুক নোমান মিয়া। প্রথম আলোকে এই ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী বলেন, গতকাল মঙ্গলবার বেলা তিনটায় তিনি রাজশাহী থেকে পরীক্ষা শেষে বাসে ওঠেন। সিরাজগঞ্জে বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে যান। এরপরই যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড়ে তীব্র যানজটে পড়েন তিনি। সেখানে তাঁকে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকতে হয়। সেখানে যতগুলো গাড়ি আটকে ছিল, তার সব কটি গাড়িতে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ছিলেন বলে তাঁর ভাষ্য।

রাজশাহী সুশিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের আহ্বায়ক ফারুক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এবারে পরিস্থিতি যেহেতু অন্য রকম ছিল, তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসেই অস্থায়ীভাবে আবাসনের কোনো ব্যবস্থা করতে পারত। আর তীব্র যানজট আর ইজিবাইক-রিকশার কয়েক গুণ ভাড়ার বিকল্প হতে পারত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো। এই বাসগুলো সড়কে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য ছেড়ে দিলে তাঁরা অন্তত পকেটকাটা ভাড়া ও যানজট থেকে রেহাই পেতেন।

তিন ইউনিটে অনুপস্থিতির হার ২০ শতাংশের বেশি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৪৭ জন শিক্ষার্থী। তবে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ১ লাখ ১ হাজার ৩৯২ জন। অনুপস্থিত ছিলেন ২৬ হাজার ২৬৫ জন শিক্ষার্থী, যা মোট আবেদনকারীর ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এবারের পরীক্ষার মাধ্যমে বিশেষ কোটা ব্যতীত ৪ হাজার ১৭৩টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারে আবাসিক হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা নেওয়ায় তীব্র আবাসনসংকট ছিল রাজশাহীতে। এই কারণে অনেকেই রাজশাহীতে আসেননি। তাঁদের মধ্যে ছাত্রীরাই বেশি। সূত্র আরও জানায়, ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিষয়গুলো নিয়ে গঠিত ‘সি’ ইউনিটে সবচেয়ে বেশি ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। বাণিজ্য শাখার ‘বি’ ইউনিটে শেষ দিনের পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন ২০ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ পরীক্ষার্থী। সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের বিষয়গুলো নিয়ে গঠিত ‘এ’ ইউনিটে অনুপস্থিতির হার ছিল ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য মো. সুলতান-উল-ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে তাঁদের আবাসিক হল বন্ধ রাখতে হয়েছে। এ জন্য অনেক ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। অটোরিকশা ভাড়া থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। এবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁরা ভবিষ্যতে ভর্তি পরীক্ষা বিভাগীয় শহরে নেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে ভাবছেন।

অনুপস্থিতির হারের বিষয়ে মো. সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, বারবার ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন করতে হয়েছে। অনেকে এ জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে হয়তো ঝুঁকে পড়েছেন। আবার যখন দেখছেন, রাজশাহীতে তীব্র আবাসনসংকট দেখা দিচ্ছে, তখন অনেকেই হয়তো আসেননি। তবে ৮০ শতাংশ উপস্থিতি কিন্তু কম নয়।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন