default-image

‘ভোট আসলেই প্রার্থীরা আমাদের ভাইবোন বনে যান। মাইকে অমুক ভাইকে, তমুক আপাকে ভোট দেন বলে প্রচার করেন। ভোটের আগে কষ্টের দিনে যে কোনো খোঁজ নেননি, সেও এখন নিজেকে বিশিষ্ট সমাজসেবক বলে প্রচার চালাছেন। বাড়িতে এসে হাসি হাসি মুখে বুকে টানে নিচ্ছেন। ভোট গেলেই আর তাঁদের কারও খবর থাকে না।’

এসব কথা ঠাকুরগাঁও পৌর এলাকার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের (৫৮)। নির্বাচন নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা জানতে চাইলে তিনি এসব কথা বলেন।

তাহলে কি ভোট দিতে যাবেন না, এই প্রশ্নের জবাবে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অবশ্যই যাব। আমাদের কষ্টে কেউ খোঁজ নেননি, তাতে কী? এরপরও প্রার্থীদের মধ্যে যাঁকে এলাকার জন্য ভালো মনে হবে, তাঁদের ভোট দেওয়ার চিন্তা আছে।’

চলমান পৌর নির্বাচনের চতুর্থ ধাপে ১৪ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও ও রানীশংকৈল পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই দুটি পৌরসভায় এবার মেয়র পদে ১৫, সাধারণ কাউন্সিলরে ৯৩ ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ২২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পৌর এলাকার মানুষের সঙ্গে বিরামহীন গণসংযোগ করে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। চলছে মাইকে প্রচারণা। পৌর এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন কর্মীরা।

বিজ্ঞাপন

গতকাল বৃহস্পতিবার ও আজ শুক্রবার ওই দুই পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার ভোটারের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। সে সময় তাঁদের কথায় ভোটের প্রচারণার সময় ও ভোট-পরবর্তী অভিজ্ঞতা উঠে আসে।

ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার আবদুল আজিজ (৬৭) এলাকায় চা বিক্রি করে জীবন চালান। তাঁর কাছে প্রার্থীদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রার্থীদের প্রচারণার মাইকের শব্দে কান ঝালাপালা। প্রার্থীদের সবাই এখন সৎ, যোগ্য, বিশিষ্ট সমাজসেবক ও দুনীতি-অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই তাঁদের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্য আর থাকে না।

ঠাকুরগাঁও রোড এলাকার খালপাড়ার গৃহবধূ রওশন আরা বলেন, ‘করোনা শুরুর সময় খুব কষ্টে ছিলাম। কেউ খোঁজ খবর নেননি। কিন্তু ভোটের সময় প্রার্থীরা ঠিকই বারবার বাড়িতে এসে খোঁজ নিচ্ছেন। ভোট চলে গেলে তো আর কারও খবর থাকে না। তাঁদের নিয়ে এত ভাববার কী আছে?’

ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে আটজন প্রার্থী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রচারণা চালাচ্ছেন মেয়র ও সংরক্ষিত আসনের আরও ছয় প্রার্থী। ওয়ার্ডে ১৪টি মাইকের শব্দে কান ঝালাপালা অবস্থা। প্রার্থীদের কর্মীরা আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে ওয়ার্ডবাসীর বিরক্তির শেষ নেই। ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবদুর রশিদ বলেন, ‘দুপুর হলেই প্রার্থীদের মাইকের শব্দে থাকা যায় না। একটু বিশ্রাম নেবেন, সেই সময় কলবেল বেজে ওঠে। দরজা খুললেই প্রার্থীর লোকজন হাতে একটা প্রতীকের ছবি ধরিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছেন।’

প্রার্থীর কর্মী-সমর্থদের এমন বিরক্তির হাত থেকে রক্ষায় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফেরদৌস আরা বাড়ির কেচি গেটে প্রার্থী-সমর্থকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটা অনুরোধলিপি ঝুলিয়ে দিয়েছেন। সেখানে লেখা রয়েছে, ‘এই পৌরসভায় আমাদের ভোট নেই। তাই ভোট চাইতে এসে অযথা সময় নষ্ট করবেন না।’

রানীশংকৈল পৌরসভার কলেজপাড়া এলাকার কবিতা রানী (৬২) বলেন, ‘পাঁচ বছর পৌর কাউন্সিলের পেছনে ভাতার কার্ডের জন্য ঘুরেও পাওনি। এখন ভোট আসিছে। যারা এত দিন মোক পাত্তা দিলনি, ওমরাই এলা মোক দিদি-দিদি করে কত কথা কহছে, কত কী দিবা চাহাছে। মুই এলা বুঝে গেইছু, ওমারলাক ভোটের পরে আর পাওয়া যাবেনি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলার সভাপতি প্রবীণ শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে বলেন, প্রার্থীরা পৌর উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য পৌর শহর বাস্তবায়ন করতে হলে কী কী করবেন, তা কোনো প্রার্থীই সঠিকভাবে তুলে ধরছেন না। ভোটের আগে সব প্রার্থী নিজেকে সৎ, যোগ্য, অন্যায়-দুর্নীতির বিরুদ্ধে নির্ভীক, সমাজসেবক দাবি করে ভোট চাইছেন। কিন্তু ভোট পেরোলেই তাঁদের মধ্যে সেই চেতনার আর দেখা পাওয়া যায় না। পৌরবাসীর সুখ-স্বস্তির জন্য ন্যায়পরায়ণ ও পরোপকারী ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা শুধু ভোটের সময় নয়, সব সময়ই পৌরবাসীর ভাইবোন হবেন।

বিজ্ঞাপন

রানীশংকৈল পৌরসভার আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি তৃণমূলের মানুষ। ছাত্রলীগ থেকে রাজনীতি করে আসছি। আমি এলাকার সব শ্রেণির মানুষের পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব।’

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার বিএনপির মেয়র প্রার্থী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিদের নামে অনেক সময় নানা অভিযোগ শোনা যায়। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, পৌরবাসীর সুখ-দুঃখে আমি সব সময় পাশে ছিলাম। নির্বাচনের পরও পৌরবাসী ভাইয়ের মতোই আমাকে তাঁদের পাশে পাবেন, এটা নিশ্চিত করছি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন