বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সূর্য ওঠার আগে মাছঘাটে ক্রেতার ভিড়

আজ ভোরে ফজরের আজান হয়ে গেছে, সূর্য তখনো ওঠেনি। এরই মধ্যে মোটরসাইকেলের ভোঁ ভোঁ শব্দ কানে আসে। সামর্থ্যবানেরা ভোলার মাছঘাটে মাছ কিনতে যাচ্ছেন। ক্রেতাদের হাতে বাজার ব্যাগের বদলে বস্তা দেখা যায়। বোঝাই যাচ্ছে, বেশি করে ইলিশ কিনতে যাচ্ছেন তাঁরা। ভোলা সদর উপজেলার তুলাতুলি, নাছিরমাঝি, ভোলা খালের মাথা, দৌলতখানের মাঝিরহাট মাছঘাটে গিয়ে একই দৃশ্য দেখা যায়।
আড়তদারেরা জানান, এক সপ্তাহ ধরে ঘাটগুলোতে স্থায়ী ফড়িয়া ও পাইকারি ব্যবসায়ীর চেয়ে খুচরা ক্রেতাদের ভিড় বেশি। ইলিশ মাছের দামও হাঁকা হচ্ছে বেশি। ৭ থেকে ৮টি জাটকায় এক কেজি, এমন ইলিশের হালির (৪টি) দাম উঠছে ২০০ থেকে ২৮০ টাকা। কেজি পড়ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা।

ভোলা খালের মাথা মাছঘাটে উপজেলার আলীনগরের ক্রেতা সোয়েব আখতার (৫০) আড়তদারের বাক্সের কাছে বসে আছেন। তিনি বলেন, ‘দামে মিল করতারি না, ঘণ্টার বেশি ঘোরাঘুরি করতেছি। এট্টু জিরাই।’

এ ঘাটেই কথা হয় আরেক ক্রেতা ওয়েস্টার্নপাড়ার মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সাড়ে ১০ হালি জাটকা লোইছি। ৪ থেকে ৫টায় কেজি অইবো। হালি পড়ছে ১ হাজার ৫০ টাকা।’ উপজেলার পাঙাশিয়ার ক্রেতা নুরে আলম বলেন, ‘২২ দিন নদীর মাছ ধরা বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে রাজাপুর জোড়খাল মাছঘাট থেকে ৪০০ টাকা হালিতে জাটকা কিনছি।’

অনেকে ইলিশ কিনতে পারেননি

কালিবাড়ি রোডের বাসিন্দা মো. শামীম ইলিশ মাছ কেনার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু পছন্দমতো ইলিশ না পেয়ে ফিরে এসেছেন। শামীম বলেন, ঘাটে মাছের দাম বেশি। আর সব জাটকা। তাই ইলিশ না কিনে ফিরে এসেছেন।

ভোলা খালের মাথা মাছঘাটে চার হাজার টাকায় মাছ বিক্রি করে বেশ খুশি দেখা যায় মোফাজ্জ্বল হোসেনকে। তিনি বলেন, ‘কুচা (ছোট) ইছা মাছ (চিংড়ি) আনছিলাম। দুই-আড়াই হাজার টাকা দাম পামু আশা করছিলাম। কিন্তু চাইর হাজারে বেঁচছি।’

দাম বেশি হওয়ায় ও অভাবের কারণে সন্তানের জন্য ইলিশ নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেননি
নাছিম মাঝি

বড় ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া

৭৫০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশের হালি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। কেজির ওপরের ইলিশ সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। আবার দুই কেজির ওপরে উঠলে সেটির দামের সীমা থাকে না বলে জানালেন ভোলা সদরের তুলাতুলি মাছঘাটের আড়তদার মো. ইউনুস (৫৪)।

ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলায় মেঘনা নদীতে জেলে মো. আলমগীর হোসেন মাঝি গতকাল শনিবার ভোরে ছোট-বড় মিলিয়ে ছয়টি ইলিশ পেয়েছেন। এর মধ্যে একটির ওজন আড়াই কেজি। উপজেলার শশীগঞ্জ জলকপাট মাছঘাটে ফখরুল আলম জাহাঙ্গীরের আড়তে আলমগীর মাছগুলো বিক্রি করেছেন। বড় ইলিশটি ডাকে উঠেছে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। বাকি ৫টি ইলিশের দাম উঠেছে ৩ হাজার টাকা। মাছগুলো কিনে নেন মো. কুট্টি ব্যাপারী।

জেলে পরিবারকে ২০ কেজি করে ১১ হাজার ১১৯ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হবে। এরপরও যদি কেউ মাছ শিকারে নামেন, আর ধরা পড়েন, তাহলে কমপক্ষে এক বছর ও সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।

ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর এই প্রথম তজুমদ্দিন উপজেলার মেঘনায় এত বড় ইলিশের দেখা মিলেছে। মাছটি অধিক লাভে বিক্রির আশায় ঢাকায় মোকামে পাঠানো হয়েছে।

ইলিশ বিক্রি না করে ভাগ করে নিলেন তাঁরা

সাগর মোহনার ইউনিয়ন ঢালচর। এই চরের জেলে মো. নুরে আলম মাঝি (৪২)। গতকাল বিকেলে ও দিবাগত রাতে তিনি ও তাঁর ভাগীরা মিলে ৩৮টি ইলিশ ধরেছেন। সব ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের। এসব ইলিশ বিক্রি না করে ভাগীরা মিলে ভাগ করে নিয়েছেন। নুরে আলম বলেন, ‘ ইলিশের দাম বেশি, কিন্তু ঘরসংসারের মাইনষের তো ইলিশ খাইতো মন চায়। হের লাইগগা সবাইরে (ভাগী) ভাগ করি দিছি।’

ভোলা সদর উপজেলার আবদুল আলী বলেন, ‘রাইতের খেওয়ে জাইল্যারা যে ১২ হালি ইলিশ পাইছে, সব ভাগ করি নিছে। সব জাটকা। এই মাছে কী পোলাপানের মন ভরে।’

ইলিশ ছাড়াই ঘরে ফেরা

default-image

বাবা-ছেলে পাঁচজন আর ভাগী একজনসহ ছয়জন মিলে মেঘনায় মাছ ধরতে গিয়েছিলেন চৌধুরী মাঝি (৫৬)। বাড়ি তাঁর ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নে। ইলিশ ছাড়াই আজ ফজরের আজানের সময় ঘাটে ফিরেছেন তাঁরা। প্রায় ৬০০ টাকার তেল পুড়িয়ে তাঁরা জাটকা ধরেছেন একটি। ক্ষোভে-দুঃখে মাছটি বিক্রি না করে ভাগী আবদুর রহিমকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নদীতে মাছ নেই দেখে সাগর মোহনায় গত বৃহস্পতিবার ২৫ হাজার টাকার বাজার নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন শাহাবুদ্দিন মাঝি। নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় আজ ভোরে দৌলতখান উপজেলার মাঝিরহাট মাছঘাটে ফিরেছেন। মাছ বিক্রি করেছেন ৩৫ হাজার টাকায়। মাছের মধ্যে বড় ইলিশ কম। জাটকা আর পোয়া মাছই বেশি।

শাহাবুদ্দিন মাঝি আরও বলেন, তিন মাস (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নদী ও সাগর মোহনায় মাছ ধরেছেন। বাড়িতে খুব একটা যাওয়া হয়নি। নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় নৌকার সব কিছু গুছিয়ে ডাঙায় উঠতে হবে। হিসাব–নিকাশ শেষে ভাগীর হাতে এক দুই হালি বড় ইলিশ ধরিয়ে দেওয়া কর্তব্য ছিল। কিন্তু অভাবের কারণে পারেননি। বিক্রি করে দিয়েছেন। দিয়েছেন শুধু জাটকা আর পোয়া মাছ।

প্রায় আড়াই মাস সাগরে থেকে গতকাল বাড়ি ফিরেছেন লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নের চর শাহাজালালের মো. নাছিম মাঝি (৩৭)। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ফেরার দিনে মাত্র ১৩ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। একটি মাছও ভাগীর হাতে তাঁর পরিবারের জন্য দিতে পারেননি। নাছিম মাঝি বলেন, দাম বেশি হওয়ায় ও অভাবের কারণে সন্তানের জন্য ইলিশ নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেননি তিনি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন