বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর ভোলার নদীগুলো বিপজ্জনক অঞ্চলের আওতায় পড়ে। এ সময় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী এবং সাগর মোহনায় লাইসেন্স ছাড়া কোনো নৌযান যাত্রী বহন করতে পারবে না। কিন্তু ওই আইন লঙ্ঘন করে ইলিশা (ভোলা)-মজুচৌধুরীরহাট (লক্ষ্মীপুর), তুলাতুলি (ভোলা)-মতিরহাট (লক্ষ্মীপুর), দৌলতখান (ভোলা)-আলেকজান্ডার (লক্ষ্মীপুর), হাকিমউদ্দিন (ভোলা)-আলেকজান্ডার (লক্ষ্মীপুর), স্লুইসগেট (তজুমদ্দিন, ভোলা)-হাজিরহাট (মনপুরা), কচ্ছপিয়া (চরফ্যাশন, ভোলা)-ঢালচর (চরফ্যাশন, ভোলা) এবং ভেদুরিয়া (ভোলা)-লাহারহাট (বরিশাল) নৌপথে অবৈধ স্পিডবোট ও ট্রলার চলছে। তবে এসব নৌপথে এ সময় শুধু সি–ট্রাক ও ফেরি চলতে পারবে।

এ বিষয়ে ভোলা নদীবন্দরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। কিন্তু পুলিশ ও প্রশাসন ছাড়া তিনি কী করতে পারেন। তিনি ঈদের কয়েক দিন নিয়মিত ঘাটে অভিযান চালানোর অনুরোধ করে প্রশাসনের কাছে চিঠি লিখবেন।

ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, তিনি এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

default-image

রোববার দুপুরে স্পিডবোটে ওঠার জন্য দৌড়াচ্ছিলেন ভোলার চরফ্যাশন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মো. সেলিম (৩২)। দৌড়ানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি কুমিল্লার একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। রাত ১০টায় কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। তাই তিনি দ্রুত পৌঁছানোর জন্য স্পিডবোট ঘাটের দিকে ছুটছেন। কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্পিডবোটে নদী পার হতে চাইছেন, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘যদি সত্যিই চরে আটকাইয়া যায়, তাহলে যথাসময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারব না।’

ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক পারভেজ খান বলেন, তাঁরা ডুবোচরের কারণে জোয়ার-ভাটা মেনে ফেরি চালান। তাই আল্লাহর হুকুম ছাড়া আটকে যাওয়ার ভয় নেই। যাতে যাত্রীদের সমস্যা না হয়, সে জন্য ঈদ উপলক্ষে চারটি কনকচাঁপা, কিষাণী, কলমিলতা, কুসুমকলি দেওয়া হয়েছে। সকাল থেকে দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত চারটি ফেরি ভোলার ইলিশা ফেরিঘাট থেকে ছেড়ে গেছে। আবার সেখান থেকে বিকেলে ফেরিগুলো ছেড়ে আসবে। কিন্তু নিরাপদ ফেরি রেখে যাত্রীরা ডেঞ্জার জোন উপেক্ষা করে অবৈধভাবে ট্রলার-স্পিডবোট যাচ্ছেন। এ অবৈধ নৌযান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাঁর নয়, বিআইডব্লিউটিএর।

রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, ফেরিঘাটের পশ্চিমে ট্রলারে যাত্রী ওঠানো হচ্ছে। মো. সোহাগ নামের এক তরুণ ডেকে ডেকে ট্রলারে যাত্রী ওঠাচ্ছেন। কেন যাত্রী ওঠাচ্ছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘মাঝি উডাইতো কোইছে, হ্যার লাই উডাই। আমি ট্রলারে কাজ করি। মাঝি কোই গেছে জানি না।’

স্থানীয় লোকজন জানান, রোববার ভোরেই এসব অবৈধ নৌযান চলা শুরু হয়। ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরীরহাট ঘাটের উদ্দেশে কমপক্ষে ৫০টি অবৈধ ট্রলার-স্পিডবোট ছেড়ে গেছে। এসব নৌযান চলাচল বন্ধে প্রশাসনের কোনো তৎপরতা নেই। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শতাধিক যাত্রী নিয়ে সাইফুল মাঝির অবৈধ ট্রলার ইলিশা চডারমাথা মাছঘাটে নোঙর করে।

default-image

সাইফুল মাঝি জানান, তিনি ভোরে শতাধিক যাত্রী নিয়ে লক্ষ্মীপুর গিয়েছিলেন। আবার মজুচৌধুরীররহাট ফেরিঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে ফিরেছেন। একজন যাত্রীর ভাড়া নিয়েছেন ৩৫০ টাকা। এ টাকার ভাগ দিতে হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের। ভোলার ইলিশাঘাটে ট্রলার নিয়ন্ত্রণ করেন মফিজুল ইসলাম সরদার। তবে তিনি ট্রলারভাড়ার ভাগ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি ১০-১২ দিন পর আজই ঘাটে গেছেন। তাঁকে না জানিয়েই ট্রলারমালিকেরা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ট্রলার চালাচ্ছেন।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ফেরিঘাটের আরও পশ্চিমে চডারমাথা মাছঘাটের সামনে থেকে একের পর এক স্পিডবোট ছেড়ে যাচ্ছে লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরীরহাট ফেরিঘাটের উদ্দেশে। একটি স্পিডবোটে ১০-১২ জন যাত্রী ওঠানো হচ্ছে। এসব স্পিডবোটে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এসব স্পিডবোট নিয়ন্ত্রণ করছেন ট্রলারচালক মিলন জমাদ্দার। কিন্তু মিলন জমাদ্দার স্পিডবোট নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কাউকে নিয়ন্ত্রণ করছেন না, যে যাঁর মতো ডেঞ্জার জোন উপেক্ষা করে স্পিডবোট চালাচ্ছেন।

নৌযান বৈধ আর অবৈধ যা-ই হোক, ইলিশা লঞ্চঘাটের ইজারাদারকে ঠিকই টোল দিতে হয়। অবৈধ নৌযান হলে ইজারাদার মোটা টাকা নেন। ইলিশা লঞ্চঘাটের ইজারাদার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হোসেন শহীদ সরোয়ার্দি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নৌযান বৈধ আর অবৈধ যা-ই হোক, ইলিশা লঞ্চঘাটের ইজারাদারকে ঠিকই টোল দিতে হয়। অবৈধ নৌযান হলে ইজারাদার মোটা টাকা নেন। ইলিশা লঞ্চঘাটের ইজারাদার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হোসেন শহীদ সরোয়ার্দি। তিনি অবৈধ নৌযানের কাছ থেকে টোল আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বাধা দিলেও অবৈধ নৌযানের মাঝিরা বাধা উপেক্ষা করে চলছেন।

ফেরির ইজারাদার (যাত্রী) মো. আক্তার হোসেন বলেন, তাঁরা ফেরিতে ভাড়া নেন ৭০ টাকা। আর অবৈধ স্পিডবোট-ট্রলারে ভাড়া নেন ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এসব অবৈধ যানের মাঝিরা যাত্রীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ফেরিতে উঠতে বাধা দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ভোলার ইলিশা ফেরিঘাটে নৌ থানা ও পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থাকার পরও এসব অবৈধ নৌযান যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে।

রোববার দুপুরে ফেরিঘাটে গিয়ে ইজারাদার (যাত্রী) মো. আক্তার হোসেনের কথার সত্যতা পাওয়া গেছে। ওই সময় কোনো পুলিশকে কর্তব্য পালন করতে দেখা যায়নি। নৌ থানায় গিয়ে দুজন কনস্টেবল ও একজন সহকারী উপপরিদর্শককে (এএসআই) পাওয়া যায়। এএসআই চন্দন বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন। তিনি ডিউটি শেষে এসেছেন। লুকিয়ে-চুরিয়ে অবৈধ নৌযান চলছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন