‘প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। তাজগীরের জীবনযুদ্ধ সে প্রমাণই দেয়। ছেলেটি দরিদ্র, কিন্তু মেধাবী ও বিনয়ী। তার পাশে আমাদের সবার থাকা দরকার।’
মিতা শফিনাজ, নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাজগীরের বাবার বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চকলক্ষ্মীপুর গ্রামে। বাবা শাহাদত হোসেন বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি লাকসামের খুনতা গ্রামে বসবাস করেন। তখন তিনি লাকসামে ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। ২০১৭ সালের মার্চে তাজগীরের মা তাছলিমা বেগম মারা যান। তখন তাজগীর নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। চার ভাইয়ের মধ্যে তাজগীর সবার বড়। এ অবস্থায় টানাপোড়েনের সংসারে তাজগীর হতাশ হয়ে পড়েন। তখন নানাবাড়িতে থেকে ভ্যানে করে গাছের চারা বিক্রি শুরু করেন। এরই মধ্যে তাজগীরের বাবা আবার বিয়ে করেন।

সব মিলিয়ে হতাশ তাজগীর চিন্তা করেন, কোনোভাবেই পড়াশোনা বন্ধ করা যাবে না। প্রবল ইচ্ছাশক্তি নিয়ে ২০১৯ সালে লাকসামের বরইগা জ্যোতিপাল মহাথের বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৪.৯৪ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর এইচএসসিতে লাকসামের নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পান। ১ এপ্রিল মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন তাজগীর। ৫ এপ্রিল ফল প্রকাশিত হয়। জাতীয় মেধাতালিকায় ২৫৯৫তম হয়ে তাজগীর খুলনা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান।

তাজগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি যখন বরইগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাই, তখন মা বলেছিলেন, “তোকে ডাক্তার বানাব। ভিক্ষা করে হলেও তোকে ডাক্তারি পড়াব।” মায়ের কথাটি আমার মনে ছিল। এরপর জেএসসিতে জিপিএ-৪.৮০ পাই। নবম শ্রেণিতে থাকতে মা মারা যাওয়ার পরও আমি গতি হারাইনি। শ্রেণিকক্ষে বরাবরই আমার রোল ১ ছিল। আজ আমি মেডিকেলে চান্স পেয়েছি। মা বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন। আমি তাঁর আঁধার ঘরের মানিক হতাম। তবে এখন পড়াশোনার খরচ নিয়ে টেনশনে আছি।’

তাজগীরের বাবা শাহাদত হোসেন বলেন, ছেলের এমন সাফল্যে তিনি খুব খুশি হয়েছেন। তবে এখন পড়াশোনার খরচ কীভাবে চলবে, সেটা নিয়ে তিনি চিন্তা করছেন।

তাজগীরের স্কুলশিক্ষক হাসনে হেনা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেটি তার মায়ের কথা রেখেছে।’ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাজগীর আরও ভালো করবেন বলে মনে করেন তিনি।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মিতা শফিনাজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। তাজগীরের জীবনযুদ্ধ সে প্রমাণই দেয়। ছেলেটি দরিদ্র, কিন্তু মেধাবী ও বিনয়ী। তার পাশে আমাদের সবার থাকা দরকার।’